সুফি সাগর সামস্

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শুধু আবেগঘন বিদায় নয়, এটি একটি কঠিন প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছে—আমরা কি তাঁর রাজনীতি থেকে কিছু শিখেছি, নাকি কেবল শোকসভা আর আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করব?
তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করেছে, বেগম খালেদা জিয়া নিছক কোনো দলীয় নেত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু এই জনসমর্থন আমাদের গর্বের পাশাপাশি লজ্জার কারণও বটে। কারণ, যে রাজনীতিবিদকে মানুষ মৃত্যুর পর ঐক্যের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিল, জীবদ্দশায় তাঁকেই দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়ন, অপমান ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্বের অভাব নয়, সংকট রাজনৈতিক চরিত্রের। বেগম খালেদা জিয়া সেই চরিত্রের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছিলেন। তিনি মতাদর্শে দৃঢ় ছিলেন, কিন্তু মতভিন্নতার প্রতি শত্রুতাপরায়ণ ছিলেন না। আজকের রাজনীতিতে যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রু, সেখানে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় বিলুপ্ত।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্ষমতা ধরে রাখা তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল না। ১৯৯১ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন—এসব সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়। বর্তমান রাজনীতিতে এমন আত্মসংযম কল্পনাও করা যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন নিপীড়নের মধ্যেও তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি বেছে নেননি। রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার করে বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা—এই সবকিছুর বিরুদ্ধে তাঁর নীরব কিন্তু দৃঢ় অবস্থান আজকের রাজনীতিকে নগ্ন করে দেয়।
আজকের বাংলাদেশে রাজনীতি মানেই অশালীন ভাষা, সামাজিক মাধ্যমে চরিত্র হনন, মব সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির প্রকাশ্য ব্যবহার। নির্বাচন মানেই ভয় ও আতঙ্ক। এই বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি যেন একটি অস্বস্তিকর স্মৃতি—কারণ এটি আমাদের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।
তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই শোকাহত হয়ে থাকে, তবে তার প্রমাণ দিতে হবে আচরণে। সামনে যে নির্বাচন আসছে, সেটি হবে একটি পরীক্ষা—রাজনীতি কি আদর্শের পথে ফিরবে, নাকি আবারও ক্ষমতার নগ্ন লড়াইয়ে পর্যবসিত হবে?
বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা কোনো স্লোগানে নয়, কোনো পোস্টারে নয়। শ্রদ্ধা মানে হলো—ভিন্নমতকে সহ্য করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভাবা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা।
যদি আমরা এই ন্যূনতম শিক্ষাটুকুও গ্রহণ করতে ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস একদিন কঠোরভাবে বলবে—বাংলাদেশ একজন সহিষ্ণু নেত্রীকে বিদায় দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর রাজনীতিকে বাঁচাতে পারেনি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


