
‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’—এই স্লোগান কেবল একটি শব্দমালার সমষ্টি নয়; এটি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম ও নৈতিক দায়িত্বের ঘোষণা। ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, দেশের সংকট মোকাবেলায় দাঁড়িয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় নিজেদের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ শুধুই যুদ্ধবিদ্যার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী নয়; এটি একটি সংগঠিত, সুদৃঢ়, পেশাদার ও মানবিক প্রতিষ্ঠান, যা দেশের অগ্রগতিতে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় সমানভাবে অবদান রাখে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো নির্মাণ—প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাদের শৃঙ্খলাভিত্তিক পেশাদারিত্ব দেশের জন্য অনন্য উদাহরণ।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন হলো বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদার এক মানদণ্ড। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক পর্যবেক্ষক মিশন থেকে শুরু করে নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, বসনিয়া, কঙ্গো, মালি, দক্ষিণ সুদান এবং আরও নানা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে শান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। আজ ৪০টি স্থানে ৫৬টি মিশনে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৩৭ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪০ জনেরও বেশি নারী শান্তিরক্ষী নিজস্ব সাহসিকতা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় নারীর অবদানকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
তবে এই গৌরব সহজে অর্জিত হয়নি। শান্তিরক্ষা মিশনে ১৬৮ জন বাংলাদেশি শহীদ হয়েছেন। তারা জীবনবাজি রেখে স্থানীয় জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন, ল্যান্ডমাইন নিষ্ক্রিয় করেছেন, মানবিক সহায়তা প্রদান করেছেন। ১৯৮৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল করিম, ২০০৩ সালে বেনিনে ১৫ জন শান্তিরক্ষী, ২০০৫ সালে কঙ্গোতে ৯ জন—এই আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু সাহসিকতার জন্যই প্রশংসিত নয়; তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণ জাতিসংঘের বিভিন্ন মেডেল ও প্রশংসাপত্রে স্বীকৃত। ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলাদেশকে শান্তিরক্ষা বাহিনীর ‘মজ্জা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। প্রতিটি মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে স্থাপন করেছেন দৃঢ় সম্পর্ক—যা স্থায়ী শান্তির ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে।
আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই ভূমিকা শুধু আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা নয়; এটি দেশের জাতীয় আত্মমর্যাদা, গর্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক দীপ্ত দৃষ্টান্ত। যারা বলবেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে পারে না—তাদের চোখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই চিরন্তন উদাহরণ দেখানো উচিত।
আজ, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত প্রকট, তখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সাহস, শৃঙ্খলা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে আছেন। জাতিসংঘের প্রশংসা, স্থানীয় জনগণের ভালোবাসা এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করছে—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশেই নয়, বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হিসেবেও স্বীকৃত।
আমরা যদি সত্যিই আমাদের জাতীয় গর্ব এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষা করতে চাই, তবে এই বাহিনীর অবদানকে কখনও কমিয়ে দেখার কোনো অধিকার নেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের অহংকার, আমাদের অনুপ্রেরণা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ—যারা সাহস, সততা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে বিশ্বের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আমাদের সকলের নৈতিক কর্তব্য।
এটি শুধুই বাহিনীর কীর্তি নয়; এটি আমাদের দেশের আত্মমর্যাদার জয়।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


