বিশেষ প্রতিবেদন

বিশ্ববাজারে ধানের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় এবং আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা কমায় ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে চালের দাম। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বাজারে চালের গড় দাম এ পর্যন্ত ৩১ শতাংশ কমেছে। ২০২৬ সালে আরও ১ শতাংশ কমার সম্ভাবনাও দেখেছে সংস্থাটি।
কিন্তু বৈশ্বিক এই দরপতনের প্রতিফলন বাংলাদেশি বাজারে নেই। সরকারি হিসাবে দেশে উৎপাদন বেড়েছে, মজুতও সন্তোষজনক; এরপরও দেশের বাজারে চালের দাম ঐতিহাসিক উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। কেন এই বৈপরীত্য?
বিশ্ববাজারে কেন কমছে চালের দাম
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বৈশ্বিক দামের পতনের তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে—
১. উৎপাদনের রেকর্ড বৃদ্ধি
গত কয়েক বছর ধরে এশিয়ার বড় উৎপাদক দেশ—ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম—শস্য উৎপাদন আরও বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও সরকারি প্রণোদনা এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
২. আমদানির চাহিদা কমেছে
অনেক দেশই মহামারি–পরবর্তী সময়ে নিজেদের খাদ্যশস্যের মজুত বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ এ বছর আমদানির পরিমাণ কমিয়েছে।
৩. জাহাজভাড়া ও সরবরাহ–ঝুঁকি কমেছে
বৈশ্বিক শিপিং সংকট কমে যাওয়ায় ও পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থায় চাপ নেই। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দামের ওপর।
বাংলাদেশের উৎপাদন বেড়েছে, তবু দাম কমছে না
সরকারি হিসাবে দেশে বছরে গড়ে ৩ কোটি ৮০ থেকে ৪ কোটি টন ধান উৎপাদন হচ্ছে—যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, গত তিন মৌসুমেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে।
তারপরও বাজারে দাম কমছে না। বরং মোটা চাল থেকে শুরু করে মাঝারি–গুণগত মানের চাল—সব ধরনের চালই সর্বোচ্চ পর্যায়েই বিক্রি হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যের পেছনে কয়েকটি কারণ খুঁজে পাচ্ছেন বাজার–বিশ্লেষকেরা—
কেন বাংলাদেশে দাম কমে না: গভীরতর পাঁচ কারণ
১. বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর নিয়ন্ত্রণ
চাল বাজারে মিলার ও থোকব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী কার্টেল গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তারা তৎক্ষণিকভাবে দাম সমন্বয় করে না।
২. আমদানির ওপর নীতিগত নিয়ন্ত্রণ
দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন দেখিয়ে সরকার সাধারণত শুল্ক কমায় না। ফলে আমদানি–উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক কম দামের সুবিধা নিতে পারে না। বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়, দাম উচ্চেই থাকে।
৩. পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়—ডিজেল, শ্রমিক মজুরি, গুদাম ভাড়া—সব জায়গায় ব্যয় বেড়েছে। এতে বাজারে খুচরা দামের ওপর চাপ পড়ে।
৪. কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
সারের দাম, শ্রমিক–মজুরি, সেচ ব্যাসহ উৎপাদন খরচ গত কয়েক মৌসুম ধরে বাড়ছে। মিলাররা দাবি করছে—উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারমূল্যও কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
৫. বাজার মনিটরিং দুর্বল
বাজারে সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট ঠেকানোর তদারকি দুর্বল হওয়ায় দাম বাড়ানো বা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: ২০২৬ সালেও নিম্নমুখী দাম
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—চালের দাম ২০২৫ সালে বড় পতনের পর ২০২৬ সালে আরও ১ শতাংশ কমতে পারে। এতে বৈশ্বিক খাদ্যসুরক্ষার ঝুঁকি কিছুটা কমলেও স্থানীয় বাজারে নীতিগত সমন্বয় না হলে বাংলাদেশে এর সুবিধা পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশের সামনে করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে দামের ইতিবাচক পরিস্থিতি কাজে লাগাতে সরকারকে তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে—
১. আমদানিশুল্ক হ্রাস ও বাজার উন্মুক্তকরণ
অস্থায়ীভাবে শুল্ক কমালে বাজারে প্রতিযোগিতা ফিরবে, দামও কমতে পারে।
২. মিলার–কার্টেল ভাঙতে শক্তিশালী তদারকি
মজুত যাচাই, গুদাম–পরিদর্শন এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন জরুরি।
৩. পরিবহন ব্যয় কমাতে লজিস্টিক সংস্কার
রেলপথ ও নদীপথ ব্যবহার বাড়ালে পরিবহন ব্যয় কমবে, যা সরাসরি বাজারদামে প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বৈশ্বিক খাদ্য–বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি আনলেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ হাতছাড়া করছে। অভ্যন্তরীণ নীতিগত কাঠামো, বাজারের কারসাজি ও তদারকির দুর্বলতা দূর না হলে বিশ্ববাজারে দাম যতই কমুক—দেশের ভোক্তা এর সুবিধা পাবে না।
আপনি চাইলে এই প্রতিবেদনের একটি সংক্ষিপ্ত ভার্সন, শিরোনাম–উপশিরোনামসহ নিউজ ফরম্যাট, অথবা ইনফোগ্রাফিক–স্টাইল সারসংক্ষেপ করে দিতে পারি।


