ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

১৮ বছর বয়সী এক মায়ের ১৯ সন্তান, জন্মের আগেই বাবার মৃত্যু, মায়ের মৃত্যুর ২০ দিন পর সন্তানের জন্ম—পড়লে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এসবই বাংলাদেশের সরকারি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত “সরকারি সত্য”। বাস্তবে এসব ঘটনার কোনোটিই ঘটেনি। ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ থেকে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ জালিয়াতির এই চিত্র।
একটি ভুয়া পরিবারের গল্প
রোমান আহমেদ ও মোসাম্মত মৌসুমি ইসলাম—সরকারি তথ্যমতে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী। বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ বছর। এই দম্পতির ১৯ সন্তান, যাদের বেশির ভাগই জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই ‘কার্ডিওজেনিক শকে’ মারা গেছে। বাস্তবে রোমান অবিবাহিত, ঢাকায় একটি দোকানে কাজ করেন। মৌসুমি নামে কোনো স্ত্রীই নেই তাঁর।
রোমানের জন্মনিবন্ধনের নম্বর ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকেই তৈরি করা হয়েছে একটি কাল্পনিক পরিবার। গ্রামের নাম সামান্য বদলে দিয়ে তাঁর পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়া শিশুদের বাবা হিসেবে। জন্ম দেখানো হয়েছে, আবার বিনা খরচে লক্ষ্য পূরণের সুবিধা নিতে ৪৫ দিনের মধ্যেই মৃত্যু দেখানো হয়েছে।
কেন শিশু?
২০১৩ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্মনিবন্ধনের জন্য মা–বাবার জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ফলে বাস্তবে অস্তিত্ব আছে—এমন কোনো ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করলেই সহজে তৈরি করা যায় ভুয়া শিশুর তথ্য। শিশুদের ক্ষেত্রেই জালিয়াতি বেশি, কারণ জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধনে কোনো ফি লাগে না।
টার্গেটের চাপ ও পুরস্কারের লোভ
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে তিরস্কার, বদলির হুমকি; আর সফল হলে পুরস্কার ও স্বীকৃতি। এই চাপ থেকেই অনেক ইউপি সচিব ও চেয়ারম্যান জালিয়াতির পথ বেছে নিচ্ছেন—এমন কথা নিজেরাই স্বীকার করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনে ৫০ ধাপ উন্নতি—এই ‘অসাধারণ সাফল্যের’ পেছনে লুকিয়ে আছে শত শত ভুয়া নিবন্ধন।

‘যমজ জন্ম’, ‘যমজ মৃত্যু’র হিড়িক
একই হোল্ডিং নম্বর, একই টিকা কার্ড, একই ফোন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক শিশুর জন্ম ও মৃত্যু দেখানো হয়েছে। কোথাও একই নারীকে দুই পুরুষের স্ত্রী বানিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ানো হয়েছে। কোথাও মৃত ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে নবজাতকের বাবা হিসেবে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, যেসব এলাকায় এত নবজাতকের মৃত্যুর নিবন্ধন হয়েছে, বাস্তবে সেখানে একটিও নবজাতকের মৃত্যু হয়নি।
বিপজ্জনক রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য ও পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য ঢুকে পড়া মানে রাষ্ট্রীয় ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (CRVS)’ ব্যবস্থা দূষিত হওয়া। এতে—
-
জনসংখ্যা পরিকল্পনা ভ্রান্ত হয়
-
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ভুল সিদ্ধান্ত আসে
-
অপরাধীচক্র বা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ভুয়া পরিচয় তৈরির সুযোগ তৈরি হয়
ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম সতর্ক করে বলেছেন, এই সুযোগ থাকলে রোহিঙ্গাসহ যেকোনো গোষ্ঠীর নামও সহজেই ঢুকতে পারে সরকারি তথ্যভান্ডারে।
নজরদারির ঘাটতি ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
আইন অনুযায়ী জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। তদারকির দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরাই আবার লক্ষ্যমাত্রার চাপ তৈরি করছেন। দায় স্বীকারের বদলে জনবল সংকটের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু তথ্যের নিরাপত্তা বা যাচাই ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেই।
বছরে শত কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হওয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্যভান্ডারে যদি ১৮ বছরের কিশোরীকে ১৯ সন্তানের মা বানানো যায়, তবে সেই তথ্যভান্ডার আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। ভুয়া নিবন্ধন শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, পরিকল্পনা ও নাগরিক অধিকার–সংক্রান্ত গুরুতর হুমকি।
এখনই কঠোর নজরদারি, স্বাধীন অডিট, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং টার্গেটভিত্তিক পুরস্কার সংস্কৃতি বাতিল না করলে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
সূত্র : প্রথম আলো


