সুফি সাগর সামস্

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয়, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, যাতে বিচারকরা নিরপেক্ষভাবে আইন ও সংবিধানের আলোকে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি বিচার বিভাগের জবাবদিহিতাহীনতার সমার্থক? কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কি জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জবাবদিহিতার বাইরে রাখা উচিত?
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে সাধারণত বলা হয়, বিচারকদের যদি সরকার বা সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, তাহলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিতে ভয় পাবেন। কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক অসঙ্গতি রয়েছে। রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গগুলোর কর্মকর্তা, প্রশাসক, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা কি বিবেকবর্জিত মানুষ? তারাও তো সংবিধান রক্ষার শপথ গ্রহণ করেন। যদি কেবল জবাবদিহিতার কারণে একজন বিচারক নিরপেক্ষ থাকতে না পারেন, তাহলে একই যুক্তিতে প্রশাসন বা সংসদের সদস্যরাও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। বাস্তবতা হলো, জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষতা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং সঠিক কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা নিরপেক্ষতাকে আরও শক্তিশালী করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার আগে প্রদত্ত লক্ষ লক্ষ রায় কি সবই পক্ষপাতদুষ্ট ছিল? ইতিহাস কি প্রমাণ করে যে বিচারকরা সর্বদা সরকারের নির্দেশে রায় দিয়েছেন? আবার বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর কি বিচার বিভাগ সবসময় সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন অবস্থান নিয়েছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, বিচার বিভাগের সাংবিধানিক স্বাধীনতা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদোন্নতি ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামো বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত সাংবিধানিক বিষয়গুলোর একটি ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বহু মানুষের দৃষ্টিতে এটি ছিল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হওয়ার সুযোগ থাকলেও এটি স্পষ্ট করে যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তা দেয় না। স্বাধীন বিচার বিভাগও বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে প্রায়ই বলা হয় যে, বিচারকদের ওপর উচ্চ আদালতের তদারকি রয়েছে এবং গুরুতর অসদাচরণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। যদি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্যরাই ভুল করেন, পক্ষপাতদুষ্ট হন বা কোনো প্রভাবের শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিক কোথায় প্রতিকার চাইবেন? “বিচারকের বিচার কে করবে?”—এ প্রশ্নটি আধুনিক সাংবিধানিক চিন্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল মূলত বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার একটি ব্যবস্থা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা সবসময় যথেষ্ট নয়। পৃথিবীর বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখেও বিভিন্ন ধরনের বহিরাগত পর্যবেক্ষণ, সংসদীয় শুনানি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, সম্পদ বিবরণী প্রকাশ, নৈতিকতা কমিশন এবং জনস্বার্থভিত্তিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং উভয়ই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। ক্ষমতা যদি জবাবদিহিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি এবং কর্তৃত্ববাদের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই নীতি নির্বাহী বিভাগের জন্য যেমন সত্য, আইন বিভাগের জন্যও তেমনি সত্য; বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
অবশ্যই বিচার বিভাগকে এমন কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত নয়, যা বিচারিক স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে দেয় বা বিচারকদের রাজনৈতিক প্রতিশোধের মুখে ঠেলে দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে এমন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে বিচার বিভাগের ক্ষমতা সম্পূর্ণ অপ্রশ্নযোগ্য বা অজবাবদিহিমূলক না হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই জনগণের ঊর্ধ্বে নয়; বরং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বকারী সংবিধানের অধীন।
অতএব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রয়োজন, কিন্তু স্বাধীনতার নামে জবাবদিহিতাহীনতা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত গণতন্ত্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—একটি এমন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা একইসঙ্গে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং কার্যকর জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


