নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা Global Financial Integrity (জিএফআই)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮.৩০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা) অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলার বা ৮৩ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা ও মূল্য কারসাজির মাধ্যমে এই অর্থ পাচার হয়েছে—যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং’ হিসেবে পরিচিত।
দীর্ঘমেয়াদে পাচারের পরিমাণ আরও বড়
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে আরও বড় একটি চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
গড় বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই অর্থ পাচারের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বাণিজ্য চ্যানেলই প্রধান মাধ্যম
দেশীয় গবেষণাতেও একই প্রবণতা পাওয়া গেছে। Bangladesh Institute of Bank Management (বিআইবিএম)-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
আমদানি ও রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিং) এই অর্থ বিদেশে সরানো হয়।
National Board of Revenue (এনবিআর)-এর তথ্যের ভিত্তিতে করা গবেষণায় বলা হয়, ২০১৫ সালের অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন সংশোধনের পর চিহ্নিত ৯৫টি ঘটনার সবগুলোই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে ঘটেছে, যার মোট পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়:
- ২০০৯–২০১৮ সময়ে শুধু মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে (জিডিপির প্রায় ২%)
- ২০০৯–২০২৩ সময়ে গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে (জিডিপির প্রায় ৩.৪%)
বিশেষ করে বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য এবং জ্বালানি আমদানিতে এই অনিয়ম বেশি ঘটে।
অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব
জিএফআইয়ের মতে, উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়।
এতে দেশের অর্থনীতিতে কয়েকটি বড় প্রভাব পড়ে:
- অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হয়ে পড়ে
- কর আদায় কমে যায়
- অবকাঠামো ও জনসেবায় বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস পায়
- সুশাসন ও আর্থিক স্বচ্ছতা ব্যাহত হয়
নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও করণীয়
বিআইবিএমের গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকিং ও নজরদারি ব্যবস্থায় এখনও কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। যদিও অধিকাংশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তালিকা যাচাই করতে সক্ষম, তবে আমদানি-রপ্তানির প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে মাত্র অর্ধেক ব্যাংকের।
প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ পাচার রোধে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে:
- শুল্ক ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা
- আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি
- মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
- বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।


