সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই সম্পর্ক কখনো ঘনিষ্ঠ, কখনো টানাপোড়েনপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক যে মাত্রার অস্বস্তিতে পৌঁছেছে, তা স্বাধীনতার পর নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঘনিষ্ঠতা থেকে দূরত্বে যাত্রা
অতীতেও দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল। কোনো কোনো সরকারের আমলে সম্পর্ক শীতল হয়েছে, আবার কোনো সময় ঘনিষ্ঠতার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। তবে সেই ঘনিষ্ঠতার পালাবদল ঘটে গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর।
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর থেকেই সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়। সীমান্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত ‘পুশইন’ শুরু হওয়া, যা প্রায় প্রতিদিন ঘটছে বলে অভিযোগ—এই অস্বস্তিকে আরও প্রকট করেছে।
কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও আস্থা ফেরেনি
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার বারবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠক, পরবর্তীতে ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ—সবই ইঙ্গিত দেয় যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবু বাস্তবতা হলো, এসব বৈঠকের পরও সম্পর্কের দূরত্ব কমেনি। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তারা দেখছে না।
রাজনৈতিক বক্তব্য ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
সম্পর্কের অবনতিতে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য ও গণমাধ্যমের ভূমিকা বড় প্রভাব ফেলেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা ও যাচাইহীন খবর প্রকাশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার মন্তব্য—বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ প্রসঙ্গ—দিল্লির দৃষ্টিতে ‘প্ররোচনামূলক’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঞ্চল। অতীতে ওই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগের স্মৃতি এখনো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় সক্রিয়। ফলে এ ধরনের বক্তব্য ভারত হালকাভাবে নিচ্ছে না।
সীমান্ত হত্যা ও প্রতীকী সিদ্ধান্ত
বিজয় দিবসে ফেলানী খাতুনের নামে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। সীমান্ত হত্যার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের আবেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে জড়িত হলেও, কূটনৈতিক অঙ্গনে এটি ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। একইভাবে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং অভিযুক্তদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সম্পর্ককে নতুন চাপে ফেলেছে।
পারস্পরিক তলব ও ভিসা সংকট
এই উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় দুই দেশই একে অপরের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ভারতীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিক্ষোভের জেরে বাংলাদেশ ভারতে ভিসা সেবা স্থগিত করেছে, আবার বাংলাদেশে ও ভারতে একে অপরের মিশন ও ভিসা সেন্টারে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ: সম্পর্কের বড় অন্তরায়
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ইস্যু। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে ফেরত চাইলেও ভারত সাড়া দেয়নি। এই বিষয়টি কেবল আইনি নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকেত বহন করছে।
নির্বাচনের আগে সম্ভাবনা কতটা?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন—সময় খুবই সীমিত। এই সময়ের মধ্যে অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমূল বদলে ফেলা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, আপাতত রুটিন কূটনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক বর্তমানে এক ধরনের ‘ম্যানেজড অস্বস্তি’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্য বৈরিতা নেই, কিন্তু পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক নতুন করে কৌশল নির্ধারণের পথে হাঁটবে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্টদের। তবে এক বিষয় পরিষ্কার—প্রতিবেশীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈরী সম্পর্ক কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উভয় পক্ষের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও কূটনৈতিক সংযম এখন সময়ের দাবি।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


