নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ–ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দ্রুতই কূটনৈতিক ও জনপরিসরে দৃশ্যমান উত্তাপে রূপ নিয়েছে। ছাত্র–জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। সর্বশেষ শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, রাজনৈতিক বক্তব্যে পাল্টাপাল্টি তলব, কূটনৈতিক মিশন ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজধানীতে ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
উত্তেজনার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ
গত কয়েক দিনে একাধিক ঘটনা একে অন্যকে উসকে দিয়েছে। ঢাকায় ‘জুলাই ঐক্য’ ব্যানারে ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচি পালিত হয়; এতে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১০১টি সংগঠনের নেতা–কর্মীরা অংশ নেন। একই দিনে নিরাপত্তা বিবেচনায় ঢাকার কুড়িল এলাকায় অবস্থিত ভারতীয় ভিসা সেন্টার (আইভ্যাক) দুপুরের পর বন্ধ করে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তলবে বাংলাদেশে ‘ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয় এবং ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে চরমপন্থি গোষ্ঠীর ঘোষিত কর্মসূচির বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করা হয়।
কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘ভুয়া বয়ান’ তৈরির চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ সরকার এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা তথ্যপ্রমাণ ভাগাভাগি করেনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশন ও পোস্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানানো হয়।
এর জবাবে ঢাকায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের ‘নসিহত’ গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্যে গত ১৫ বছরে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে ভারতের নীরবতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়—এ কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য যে, এর আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছিল বাংলাদেশ। তিন দিনের মাথায় নয়াদিল্লির পাল্টা তলব দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের গভীরতাই নির্দেশ করে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও নিরাপত্তা ইস্যু
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বন্ধের আহ্বানও এসেছে। সরকার অভিযোগ করছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা–কর্মীরা ভারতে বসে আসন্ন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে। এ বিষয়ে ভারতের কাছে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণের আহ্বান জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
রাজপথে প্রতিক্রিয়া: ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’
রামপুরা ব্রিজ থেকে ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে মিছিল শুরু হলে বাড্ডায় পুলিশ বাধা দেয়। উত্তর বাড্ডার হোসেন মার্কেটের সামনে প্রায় ৪০ মিনিট অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন অংশগ্রহণকারীরা। শেখ হাসিনাসহ ‘সব খুনিকে’ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি এবং ভারতীয় ‘প্রক্সি’ শক্তির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়। পরে অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এই কর্মসূচিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা, ডাকসু–জাকসু নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়–কলেজ–মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ অংশ নেন।
ভিসা সেন্টার বন্ধ: জনভোগান্তি ও বার্তা
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বলে আইভ্যাক বন্ধ করায় ভিসা আবেদনকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত আবেদনকারীদের জন্য পরবর্তীতে সময় নির্ধারণ করা হবে; তবে বন্ধের মেয়াদ সম্পর্কে স্পষ্টতা নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল নিরাপত্তা নয়—একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
কোথায় যাচ্ছে সম্পর্ক?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু তিনটি—(১) রাজনৈতিক বৈধতা ও নির্বাচন, (২) নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মিশনের সুরক্ষা, (৩) শেখ হাসিনা ইস্যু ও প্রত্যর্পণ। পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি বাড়লে সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে উভয় দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থ বিবেচনায় কূটনৈতিক সংলাপই উত্তেজনা প্রশমনের একমাত্র পথ—এমন মতও রয়েছে।
স্বল্পমেয়াদে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা, নিরাপত্তা আশঙ্কা দূর করতে তথ্য ভাগাভাগি এবং রাজপথের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। মধ্যমেয়াদে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও প্রত্যর্পণ ইস্যুতে স্পষ্ট রোডম্যাপ না এলে সম্পর্কের চাপ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়—তা নির্ভর করছে আগামী সপ্তাহগুলোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।



