সোমবার, মে ১১, ২০২৬

বরাদ্দ আছে, বাস্তবায়ন নেই: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ধীরগতি ও অর্থনীতির ঝুঁকি

পাঠক প্রিয়

ইশতিয়াক মাহমুদ মানিক

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই–নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন চিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বরাদ্দের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম হলেও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম দুর্বলতা এ সময়ে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে সরকারি বিনিয়োগ কমে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সার্বিক চিত্র: কমছে বাস্তবায়নের হার

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে অনুমোদিত ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপির মধ্যে জুলাই–নভেম্বর সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১৭ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এডিপি বাস্তবায়নের গতি ধারাবাহিকভাবে কমছে।

এই সময়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এসেছে ১৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা (১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ), প্রকল্প সহায়তা থেকে ১০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা (১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ) এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা (১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ)।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: বরাদ্দে শীর্ষে, ব্যয়ে ধীরগতি

চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। অথচ প্রথম পাঁচ মাসে এই মন্ত্রণালয়ের ব্যয় মাত্র ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ বা ৩৭৮ কোটি টাকা। ব্যয়ের বড় অংশই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতাভুক্ত কিছু প্রকল্পে সীমিত রয়েছে।

আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং অর্থ ছাড়ের ধীরগতির কারণে স্বাস্থ্য খাতের বড় প্রকল্পগুলোতে কাজ শুরুই হয়নি কিংবা অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। ফলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ব্যয় তলানিতে নেমে এসেছে।

অন্যান্য বড় মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বড় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দুর্বল বাস্তবায়ন সামগ্রিক এডিপি অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এডিপি বরাদ্দের দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম রেলপথ মন্ত্রণালয় জুলাই–নভেম্বর সময়ে ব্যয় করেছে মাত্র ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ব্যয় করেছে ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগ ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

তবে তুলনামূলকভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় সন্তোষজনক দক্ষতা দেখিয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি।

ধীরগতির পেছনের কারণ

আইএমইডির কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারের চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো ও সামাজিক খাতের প্রকল্পগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ের জটিলতা এবং প্রশাসনিক সতর্কতা কাজের গতি শ্লথ করছে।

অর্থনীতির জন্য কী বার্তা?

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এডিপি বাস্তবায়নের এই ধীরগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারি বিনিয়োগ কমবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপরও, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের মতো মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামনে চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয়

চলতি অর্থবছরে সরকার ১ হাজার ১৯৮টির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু বরাদ্দের শীর্ষে থেকেও ব্যয়ে তলানিতে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বল বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে নীতিগত পর্যায়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমত স্বাস্থ্য খাতের বড় প্রকল্পগুলোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে আইএমইডি ও অর্থ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং দুর্বল প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

এ ছাড়া নির্বাচনী সময় ও কৃচ্ছ্রসাধন নীতির মধ্যেও যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির না হয়, সে জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোকে আলাদা ট্র্যাক দেওয়ার সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো এসব নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে এডিপির গতি বাড়বে, সরকারি বিনিয়োগ কার্যকর হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ কমানো সম্ভব হবে—এমনটাই সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ