রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি: শিক্ষার্থীরা কি আবার ‘গিনিপিগ’?

পাঠক প্রিয়

ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

সংস্কারের নামে পরীক্ষা-নিরীক্ষা

কারিকুলাম ও মূল্যায়ন—এই দুই শব্দই এখন প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক ধরনের অনিশ্চয়তার। এক পদ্ধতি চালুর পরপরই তা বাতিল, নতুন নামে আরেকটি উদ্যোগ—এই চক্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ ঘিরে রয়েছে সময়গত অযৌক্তিকতা, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা এবং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা।

হঠাৎ নির্দেশিকা: কার স্বার্থে?

গত ২১ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বাস্তবায়নের জন্য ‘মূল্যায়ন নির্দেশিকা ২০২৬’ অনুমোদনের অনুরোধ জানানো হয়। চিঠির ভাষা অনুযায়ী এটি অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ের বহু শিক্ষক ও অভিভাবক এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই ‘অংশীজন’ কারা এবং তাঁদের মতামত কীভাবে নেওয়া হয়েছে?

এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী স্বীকার করেছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ এনসিটিবির ভূমিকা ছিল মূলত প্রস্তাব তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নতুন মূল্যায়নে কী বদলাচ্ছে

নির্দেশিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় সব শ্রেণিতেই লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন যুক্ত করা হয়েছে।

  • প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে যেখানে মূলত শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন ছিল, সেখানে এবার যুক্ত হচ্ছে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা।
  • তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রায় সব বিষয়ে লিখিতের পাশাপাশি মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন—এত অল্প বয়সে এত স্তরের পরীক্ষা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখা নিশ্চিত করবে, নাকি পরীক্ষাভীতি আরও বাড়াবে?

অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা বনাম নীতিনির্ধারকদের দাবি

২০২৩ সালে চালু হওয়া পরীক্ষাবিহীন কারিকুলাম নিয়ে অভিভাবকদের তীব্র ক্ষোভ ছিল। অতিরিক্ত উপকরণ কেনা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনার অভাব এবং পড়াশোনার শিথিলতা—সব মিলিয়ে সেটিকে অনেকেই ‘ব্যর্থ পরীক্ষা’ হিসেবে দেখেন। সরকার পরিবর্তনের পর ২০১২ সালের কারিকুলামে ফেরার সিদ্ধান্তকে স্বস্তি হিসেবে নিয়েছিলেন অভিভাবকরা।

কিন্তু এখন আবার নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রস্তাব তাঁদের সেই ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু স্পষ্ট করে বলেন, “নির্বাচনের আগে শিক্ষা নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চাই না। এটি হলে তা হবে হঠকারী সিদ্ধান্ত।”

সময়ের বাস্তবতা: বাস্তবায়ন কি সম্ভব?

২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রোজার কারণে অন্তত দুই মাস পাঠদান ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হলে সারাদেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে তিন থেকে চার মাস। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে ছয় মাসেরও বেশি সময় লাগবে।

এদিকে এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন কাঠামো তৈরির কাজ চলমান। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—মাত্র এক বছরের জন্য কেন এত বড় পরিবর্তন?

অর্থের হিসাব: কারা লাভবান হবে?

শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, নতুন মূল্যায়ন মানে প্রশিক্ষণ, গাইডলাইন ছাপানো, মনিটরিং ও প্রকল্প ব্যয়—সব মিলিয়ে কয়েক শ কোটি টাকার বাজেট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই বাজেটকে ঘিরে সক্রিয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নয়, বরং আর্থিক সুবিধাই নাকি এই তাড়াহুড়ার মূল কারণ।

এনসিটিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের আগ্রহেই নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে এবং বিরোধে না যেতেই তারা নীরব ভূমিকা নিয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, নির্দেশিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে। নির্বাচন সামনে রেখে নতুন সরকারের শিক্ষা পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। তাঁর ভাষায়, “শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়—এমন কিছু করা হবে না।”

শিক্ষা সংস্কার নাকি আরেকটি পরীক্ষা?

অনুসন্ধান বলছে, শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি অল্প সময়ের জন্য ব্যয়বহুল ও অস্থির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তার খেসারত দিতে হবে শিক্ষার্থীদেরই। প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি কি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য, নাকি আরেক দফা ‘গিনিপিগ’ বানানোর আয়োজন?

সূত্র: কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিবেদন অবলম্বনে অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদন

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ