পটুয়াখালী প্রতিনিধি

সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। হঠাৎই পাক-হানাদার বাহিনীর জঙ্গি বিমান পটুয়াখালীর আকাশজুড়ে গর্জে ওঠে। মুহূর্তেই শুরু হয় নির্বিচার বিমান হামলা। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই হামলায় শহরজুড়ে চলে বোমা বর্ষণ, শেলিং ও ভারী গোলাগুলি। আতঙ্কে চারপাশ যখন স্তব্ধ, তখনই সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়ে অবতরণ করে শহরের কালিকাপুর এলাকায়—বর্তমান উপজেলা পরিষদসংলগ্ন হাঁস প্রজনন খামার অঞ্চলে। এরপরই পাকিস্তানি ছত্রীসেনারা নেমে আসে উন্মত্ত বর্বরতায়।
অবতরণস্থলেই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন কালিকাপুর মাদবরবাড়ির ১৯ জন নিরীহ মানুষ। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেসামরিক জনগণ পালাতে না পারায় তাদের ওপর চলতে থাকে নির্বিচার গুলি ও হামলা।
এ সময় দায়িত্ব পালনরত তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আউয়াল পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হয়ে শহীদ হন। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে হানাদারদের প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে শহীদ হন ছয়জন আনসারসহ মোট সাতজন মুক্তিকামী মানুষ।
হামলার পর পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা শহরের পুরাতন বাজারে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। অগ্নিকাণ্ডে বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়। একইসঙ্গে শহরজুড়ে শুরু হয় অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযান।
জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আটক করা এসব মানুষকে পটুয়াখালী জেলখানার ভেতরে এনে একে একে গুলি করে হত্যা করে হানাদাররা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জেলখানার অভ্যন্তরে সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করে স্তূপ করে মাটি চাপা দেওয়া হয়। অধিকাংশ লাশ জানাজা ছাড়াই দেওয়া হয় গণকবর; এখনো তাদের অনেকের পরিচয় অজানা রয়ে গেছে।
পটুয়াখালীর ইতিহাসে ২৬ এপ্রিল ১৯৭১ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক ভয়াল দিন—নৃশংসতা, গণহত্যা ও বীরত্বের মর্মস্পর্শী স্মৃতি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও সেই দিনের ক্ষত বহন করে চলেছে শহর ও এখানকার মানুষ।


