মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ একদিকে যেমন যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি করেছে ভয়াবহ এক ঝুঁকি—ডিপফেক। ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেওয়া যায় বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজনীতিবিদ, নির্বাচন কমিশন এবং প্রযুক্তিবিদরা।
প্রচারণায় সম্ভাবনা, সুষ্ঠু নির্বাচনে ঝুঁকি
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি কিংবা ক্লাউডভিত্তিক এআই টুলের যুগে তথ্য যাচাই করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, তেমনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ডিপফেক ভিডিও বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে কোনো প্রার্থীর নামে মিথ্যা বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হলে তা ভোটের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহতথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এইচ এম সাইফ আলী খান বলেন,
“আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই। মিথ্যা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি জনগণ চায় না। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি অধিদপ্তর ও মনিটরিং সেলগুলো নিশ্চয়ই এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি আমরাও ভুয়া ঘটনা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,
“পৃথিবীর অনেক দেশ এআই ব্যবহারে আইন করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত দ্রুত আইন প্রণয়ন করা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা নয়, যোগ্যতা দিয়েই নির্বাচনে জয়ী হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশনকেও এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।”
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন,
“নির্বাচনের সময়, বিশেষ করে ভোটের রাতে এআইর অপব্যবহার বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। আমরা মিস ইনফরমেশন ও ডিজ ইনফরমেশন নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সেল গঠন করব এবং ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখব।”
গুজব মোকাবিলায় ফ্যাক্ট চেকারদের ভূমিকা
সব আশঙ্কার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বিনামূল্যের ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘খোঁজ’।
খোঁজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রযুক্তিবিদ মাহাথির আহমেদ তুষার বলেন,
“আসন্ন নির্বাচন ঘিরে টেক্সট, ছবি, ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা ভাইরাল গুজব—সবকিছুর সত্যতা যাচাইয়ে ‘খোঁজ’ হতে পারে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই ঘটনার উৎস ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব।”
প্রযুক্তি দিয়েই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী জানান,
“এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি শনাক্তের নতুন কৌশল আবিষ্কার হয়েছে। চোখের মণিতে আলোর প্রতিফলন বিশ্লেষণ করে ভুয়া ছবি চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে হবে প্রযুক্তি দিয়েই। এআই নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ টিম গঠন করা জরুরি।”
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব বলেন,
“আমরা জাতিগতভাবে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নজরদারিতে আনতে হবে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে নির্বাচন ঘিরে অত্যন্ত সক্রিয় থাকতে হবে।”
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ২০২৩ সালে স্লোভাকিয়ার নির্বাচনে একটি এআই-জেনারেটেড কথোপকথন বড় প্রভাব ফেলেছিল। একইভাবে ভারতের লোকসভা নির্বাচনেও এআই ভিডিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
ডিপফেক ও এআই-জেনারেটেড কনটেন্টের ঝুঁকি এড়াতে আইন প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয় জরুরি। নইলে প্রযুক্তির আশীর্বাদই হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের জন্য বড় অভিশাপ।


