বিশেষ প্রতিবেদন

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—কোনো দলই এককভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। ক্ষমতাসীন থেকে ক্ষুদ্র উদীয়মান দল—সবাই কোনো না কোনো জোট, মৈত্রী বা সমন্বয়ের অধীনে নির্বাচনী অঙ্ক কষছে।
ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। অনেকেই এখনো কোনো জোটে জায়গা করে নিতে পারেনি; কারও কারও আবার একাধিক জোটের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট:
এককভাবে ভোটে গেলে টিকে থাকা কঠিন—জোটই একমাত্র ভরসা।
বিএনপি: বৃহৎ বিরোধী ঐক্যের নতুন প্রচেষ্টা
বিএনপি একদিকে আন্দোলনমুখী রাজনীতি চালালেও অন্যদিকে পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বৃহৎ বিরোধী জোট পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তাদের কৌশলে তিনটি দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে—
১) পুরোনো ‘রাজপথ–সঙ্গী’দের পুনরায় এক ছাতার নিচে আনা
আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে গত কয়েক বছর যেসব দল বিএনপির পাশে ছিল—
-
গণঅধিকার পরিষদ
-
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
-
কিছু ইসলামী দল
-
নাগরিক ঐক্যের অংশ
এই দলগুলোকে ঘিরেই বিএনপি নতুন অক্ষ তৈরি করছে।
২) ইসলামি দলগুলোকে ঐক্য কাঠামোর ভেতর আনা
বিএনপি বোঝে—ইসলামি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো ভোটারভিত্তিকভাবে এখনও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় আগামী নির্বাচনে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াবে।
৩) নতুন উদীয়মান ছোট রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা
এরা সাধারণত আদর্শিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও কয়েকটি সাধারণ লক্ষ্য—
-
আওয়ামী লীগবিরোধিতা
-
নিরপেক্ষ সরকারের দাবি
—এই অভিন্ন দাবির কারণে তাদের একত্রে আনা সহজ হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী: ছায়া–ভূমিকা রেখে কেন্দ্রীয় অবস্থানে
একসময় বিএনপির প্রধান জোটসঙ্গী জামায়াত এবার প্রকাশ্যে না হলেও পর্দার আড়ালে বৃহৎ বিরোধী ঐক্যের অন্যতম কারিগর হিসেবে কাজ করছে।
তাদের লক্ষ্য—
-
বিএনপির সঙ্গে আবারও সমন্বিত নির্বাচনি প্ল্যাটফর্ম
-
ইসলামি ভোটব্যাংক ধরে রাখা
-
ছোট ইসলামী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে টানা
জামায়াতের রাজনৈতিক ক্যালকুলেশন হলো—বৃহৎ জোট ছাড়া নির্বাচনে টিকে থাকা বা প্রার্থী–প্রভাব তৈরি সম্ভব নয়।
এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি): আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন দল
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ছোট দলগুলোর একটি জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি।
তাদের অবস্থান—
১) বিএনপি–জামায়াত জোটের ‘সেতুবন্ধন’
এনসিপি বিভিন্ন ছোট ইসলামি দল, আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম ও নতুন প্রজন্মের অরাজনৈতিক নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। ফলে তারা জোট সম্প্রসারণের ব্রিজ হিসেবে উঠে এসেছে।
২) বিস্তৃত আলোচনা: ‘এনসিপি প্ল্যাটফর্ম’
এনসিপিকে ঘিরে—
-
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)
-
বাংলাদেশ জনতা পার্টি
-
কিছু নিবন্ধনহীন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম
—সমন্বিতভাবে একটি নির্বাচনি ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় আছে।
৩) এনসিপির কৌশল
-
নিজস্ব প্রতীক ধরে রাখা
-
জোটের ছায়ায় নির্বাচনে অংশ নিলেও ‘স্বতন্ত্র পরিচয়’ বজায় রাখা
-
তরুণ ভোটব্যাংক আকর্ষণ করা
-
শহুরে মধ্যবিত্ত ও ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সাপোর্ট হাতানো
বিরোধী শিবিরে সমীকরণ: বড় জোট—ছোট জোট—সমন্বয় জটিলতা
বড় জোট গঠনের পথে তিনটি বড় বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে:
১) জোটভুক্ত হলেও সবাই লড়বে নিজ নিজ প্রতীকে
আইন অনুসারে অধিকাংশ দলকে নিজস্ব প্রতীকেই ভোটে যেতে হবে।
—এতে জোটের ‘সমন্বিত কাঠামো’ তৈরি করা কঠিন হচ্ছে।
—জোটসঙ্গী দলগুলো আসন বণ্টন নিয়ে দ্বিধায় আছে।
২) BNP wants ‘umbrella coalition’ | Jamaat wants strategic alliance
বিএনপি চাইছে বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো;
জামায়াত চাইছে সমন্বিত ইসলামি অক্ষ।
—এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
৩) ছোট দলগুলোর মধ্যে অন্য জোটে যাওয়ার চেষ্টা
যেসব দল এখনো জোটে ঢোকার নিশ্চিততা পায়নি—
এরা বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, দরকষাকষি করছে।
ক্ষমতাসীন শিবিরেও ‘নিঃশব্দ সমন্বয়’
যদিও আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বৃহৎ জোট ঘোষণা করেনি,
তারপরও—
-
১৪ দল
-
জাতীয় পার্টির একটি অংশ
-
কয়েকটি প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িক ও আঞ্চলিক দল
—তাদের সঙ্গে নিঃশব্দ সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
ক্ষমতাসীনপক্ষের লক্ষ্য:
বহুমাত্রিক সমর্থন ধরে রেখে নির্বাচনে বহুদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য জোট–চিত্র
১) বৃহৎ বিএনপি–জামায়াত–এনসিপি অক্ষ
-
BNP
-
Jamaat-e-Islami
-
NCP
-
AB Party
-
কিছু নিবন্ধনহীন ইসলামি দল
-
কিছু নাগরিক প্ল্যাটফর্ম
এটি হবে বিরোধী ভোটের প্রধান সমন্বয় কাঠামো।
২) আওয়ামী লীগ–১৪ দল–মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তি
-
১৪ দল ও সহযোগী সংগঠন
-
প্রগতিশীল বাম দল
-
আঞ্চলিক দল
এটি হবে ক্ষমতাসীন অক্ষ।
৩) জাতীয় পার্টি ও অন্যরা
জাতীয় পার্টির কিছু অংশ স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান নির্ভর করবে আসন-বণ্টন ও শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।
জোট ছাড়া কেউই সামনে এগোতে পারছে না
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন খুব পরিষ্কার—
এবারের নির্বাচন ‘জোটবদ্ধ’ রাজনীতির নির্বাচন।
বিএনপি চায় বৃহৎ বিরোধী ঐক্য,
জামায়াত চায় ইসলামি অক্ষ শক্তিশালী করা,
এনসিপি হয়ে উঠছে সম্ভাব্য নতুন কেন্দ্র।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নিঃশব্দে পুরোনো অংশীদারদের ধরে রাখছে।
অতএব, আগামী নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে—
কার জোট কতটা বিস্তৃত, কতটা কার্যকর এবং কতটা মাঠ–সংগঠনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।


