অনলাইন ডেস্ক

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডসহ নির্বাচনী ইশতেহারের জনবান্ধব অঙ্গীকার পূরণে কাজ শুরু করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজস্ব আয়ের শ্লথগতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্ত পূরণের চাপের মধ্যে আসন্ন বাজেট প্রণয়নে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই টানাপোড়েনের মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ অঙ্কের ঘাটতি বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বাজেটের আকার ও ঘাটতির চিত্র
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে আট লাখ ৪৮ হাজার কোটি থেকে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার মধ্যে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট করা হয় সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় বাজেটের আকার কমানো হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। তবে নতুন অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে।
রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি
বাজেটের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। তবে তিনটি প্রধান খাতেই উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও আদায়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু
সরকার আগামী ১০ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে কার্ডধারী পরিবারগুলোকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত থোক বরাদ্দের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হলেও আগামী বাজেট থেকে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে।
এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আইএমএফের শর্ত ও ভর্তুকি সংকট
৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ভর্তুকি কমানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়সহ বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত দিয়েছে।
বিশেষ করে ভর্তুকি কমানোর চাপের কারণে নতুন পে স্কেল, কৃষক কার্ড বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির পতন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা এযাবৎকালের সর্বনিম্ন। ডিসেম্বরেও এ হার ছিল ৬.১ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেখানে এই হার ছিল ১০.১৩ শতাংশ, সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী মহলের ভাষ্য, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারি প্রকল্পের স্থবিরতায় বিনিয়োগ কমেছে। শিল্পকারখানায় কাঁচামাল আমদানিও কমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ মনে করেন, রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপে আগামী বাজেটের অর্থায়ন হবে অত্যন্ত কঠিন। বৈদেশিক অনুদান কমে আসা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
অন্যদিকে গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজস্ব আয় না বাড়লে ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ বা মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর পথ নিতে হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার সমন্বয়, বিনিময় হার বাজারমুখী করা, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং রপ্তানি-প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা যৌক্তিকীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
অংশগ্রহণমূলক বাজেটের আহ্বান
এনবিআর জানিয়েছে, অংশগ্রহণমূলক ও গণমুখী বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প ও বণিক সমিতি, গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেট হবে গতানুগতিক ধারার বাইরে। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কঠিন সমীকরণের সামনে সরকার
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, রাজস্ব ঘাটতি, আইএমএফের শর্ত, বেসরকারি খাতের স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে আগামী বাজেট সরকারের জন্য একটি কঠিন সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই অর্থায়ন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।


