সুফি সাগর সামস্

বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি কখনো নিখুঁতভাবে ছদ্মবেশে থাকে না। আজও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংঘাতের পেছনে লুকিয়ে থাকে তেল এবং মুদ্রার আধিপত্যের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি এই বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাস দেখায়—যেখানে তেল এবং ডলারের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, সেখানে ওয়াশিংটন তার কূটনীতি ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।
ইরান সেই ইতিহাসের প্রথম বড় পাঠ। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেল সম্পদ জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। পশ্চিমা কোম্পানির স্বার্থে এটি ছিল আঘাত। ফলে সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআই সিক্স যৌথভাবে ‘অপারেশন আজাক্স’ পরিচালনা করে। মোসাদ্দেক সরানো হয়, শাহ রেজা পেহলভি ক্ষমতায় বসেন, আর তেল খনিগুলো ফিরে যায় পশ্চিমাদের হাতে। ইসলামি বিপ্লবের পরেও ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু রাখার জন্য আজও নিষেধাজ্ঞার জাল বিছানো আছে।
ইরাকের কাহিনিও একরকম। সাদ্দাম হোসেন যখন ইউরোতে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেন, তখন তা মার্কিন ডলারের আধিপত্যে হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করা হয়। যুদ্ধ শেষে সেই অস্ত্র পাওয়া না গেলেও ইরাকের তেল খনিগুলো মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে মার্কিন ও বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। প্রশ্ন থেকেই যায়—যুদ্ধ কি নিরাপত্তা রক্ষার জন্য, নাকি তেলের জন্য?
লিবিয়ার পরিস্থিতিও একইভাবে দেখায় শক্তির খেলায় কতটা নির্দয় হতে পারে। মুয়াম্মর গদ্দাফি আফ্রিকান গোল্ড দিনারের মাধ্যমে ডলারে তেল বিক্রির প্রচলিত কাঠামো ভাঙতে চেয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত সামরিক হস্তক্ষেপ এবং তার নির্মম মৃত্যু। লিবিয়া আজও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে পায়নি, তবু তার তেল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে, পশ্চিমাদের স্বার্থে।
এখন ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের বৃহৎ তেল ভাণ্ডারের মালিক দেশটি আজ গভীর সংকটে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং প্রকাশ্য বক্তব্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে সমস্যা কেবল মাদুরো নয়; মূল বিষয় হলো তেল এবং তার বাজার নিয়ন্ত্রণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য এই বাস্তবতাকে আর গোপন রাখে না।
যুক্তরাষ্ট্র সবসময় দাবি করে, তারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিরাপত্তার পক্ষে। কিন্তু ইরান, ইরাক, লিবিয়া ও ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে—গণতন্ত্র এসেছে ট্যাংকের চাপের তলে, মানবাধিকার চাপা পড়েছে ধ্বংসস্তূপে, আর নিরাপত্তা রয়ে গেছে তেলের পাইপলাইনে।
এই ইতিহাস থেকে স্পষ্ট যে, বিশ্বজুড়ে সংঘাতের পেছনে তেল ও ডলারের রাজনীতি মূল চালিকাশক্তি। শক্তিধররা লাভের হিসাব রাখে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ ও দুর্বল রাষ্ট্র। এভাবে মার্কিন কূটনীতি বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা এবং সংঘাতের বীজ বপন করে যাচ্ছে। সত্যিই কি এই রাজনীতি কখনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে? ইতিহাসের পাতা জিজ্ঞেস করে—উত্তর এখনও মেলে না।
সুফি সাগর সামস্
ভাপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


