সুফি সাগর সামস্

“অর্থনৈতিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” বলতে কোনো প্রথাগত যুদ্ধ না হলেও, এটি বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক সংঘাত, অসম উন্নয়ন, নব্য–উপনিবেশবাদ, বাণিজ্য যুদ্ধ, মুদ্রার লড়াই এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের চাপকে বোঝায়, যেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব খাটিয়ে বৈশ্বিক বাজার ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করছে, যা দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নীরব আগ্রাসন চালায় এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা বাড়ায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছিল ১৯৪৫ সালে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যুদ্ধের ইতি ঘটলেও বাস্তব রাজনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াই সেখানে থেমে থাকেনি। বরং অনেকের অজান্তেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ—যার রণক্ষেত্র বন্দুক বা বোমা নয়, বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, মুদ্রা, প্রযুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা।
এই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সশস্ত্র নয়—এটি নীরব, দীর্ঘস্থায়ী এবং সর্বগ্রাসী। গত প্রায় ৮১ বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধ প্রতিটি রাষ্ট্র, প্রতিটি পরিবার এবং প্রায় প্রতিটি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত করেছে।
চীনের উত্থান ও বৈশ্বিক বাজার দখলের কৌশল
অর্থনৈতিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম সুসংগঠিত আঘাত আসে চীনের দিক থেকে। ‘উৎপাদনের বিশ্বকারখানা’ হয়ে ওঠার মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করেছে। কম দামে বিপুল পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করে চীন কার্যত বিশ্বের জনগণকে তাদের পণ্যের গ্রাহকে রূপান্তরিত করেছে।
এই কৌশল সামরিক আগ্রাসন ছাড়াই বাজার দখলের এক নতুন মডেল তৈরি করে, যা অর্থনৈতিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
ডলার, তেল এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রণ
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থনৈতিক যুদ্ধকে চালু রেখেছে ভিন্ন কৌশলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে তেল বাণিজ্যের সঙ্গে মার্কিন ডলারকে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র একটি বৈশ্বিক আর্থিক শৃঙ্খল তৈরি করে, যা আজও বহাল।
ডলারনির্ভর এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়া ক্ষমতা দিয়েছে।
ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো এই ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের মুদ্রা বা বিকল্প চুক্তিতে তেল বেচাকেনার চেষ্টা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গোপন বা বিকল্প লেনদেনকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং দেশটির তেল খাত কার্যত নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল গ্রহণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ও দ্বিমুখী মানদণ্ড
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ অর্থনৈতিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। অবরোধের মধ্যেও ভারতসহ কয়েকটি দেশ নিজ নিজ মুদ্রায় রাশিয়ার তেল কিনেছে। এর ফলশ্রুতিতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির চাপ ও অসন্তোষের মুখে পড়েছে।
এখানে প্রশ্ন উঠে—মুক্ত বাজার ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের কথা বলা শক্তিগুলো নিজের স্বার্থে গেলে কেন সেই নীতির ব্যত্যয় ঘটায়?
আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি ও যুদ্ধবাণিজ্য
অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুধু তেল বা মুদ্রায় সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থার ক্রয়–বিক্রয়ও এই যুদ্ধের বড় অংশ। যুদ্ধ এখন অনেক সময় নিজেই একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে।
ইরান, ভেনেজুয়েলা ও বৈশ্বিক সংঘাতের আশঙ্কা
বিশিষ্ট মার্কিন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জেফ্রি ডি. স্যাকস সতর্ক করেছেন—ভেনেজুয়েলার পর যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রহ বাড়ে, তবে তা একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সংঘাতের দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিতে পারে।
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, উস্কানি ও হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শক্তির নতুন মেরুকরণ
এই উত্তেজনার মধ্যেই চীন, রাশিয়া ও ইরানের যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকার জলসীমায় যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—বিশ্ব আবারও শক্তির নতুন মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে।
অর্থনৈতিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোনো ভবিষ্যৎ আশঙ্কা নয়—এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। এই যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রা, বাজার, প্রযুক্তি ও তথ্যই প্রধান অস্ত্র।এই নীরব যুদ্ধ মানবতার জন্য কম বিপজ্জনক নয়। বরং এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক আস্থাকে ক্ষয় করছে এবং সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন শক্তির রাজনীতি নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবকেন্দ্রিক কূটনীতি। অন্যথায় ইতিহাস হয়তো আবারও আমাদের শেখাবে—নীরব যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কখনো নীরব থাকে না।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


