নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে আবারও তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে শিল্প খাত। চাহিদার তুলনায় মিলছে অর্ধেকেরও কম গ্যাস, ফলে উৎপাদন কমে গেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নতুন করে রফতানি আদেশ নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড বলছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। মেরামত শেষ হলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।
১০ পিএসআই প্রয়োজন, মিলছে ৪-৫ পিএসআই
দেশের শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এন জেড টেক্স গ্রুপের কর্ণধার ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-এর সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান জানান, তাদের কারখানায় প্রতিদিন ১২০ টন সুতা, ২ লাখ মিটার কাপড় রং এবং ২ লাখ মিটার ফিনিশড কাপড় উৎপাদন হয়।
এই উৎপাদনের জন্য ১০ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআই।
তার ভাষায়,
“গ্যাস ছাড়া শিল্প এক মুহূর্তও চালানো সম্ভব নয়। রূপগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় সরবরাহে বড় সমস্যা হচ্ছে। নতুন সরকারের সঙ্গে বসে তিতাস ও পেট্রোবাংলাকে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
১২ ঘণ্টা বন্ধ কারখানা, কোটি টাকার ক্ষতি
গত দুই সপ্তাহ ধরে সরবরাহ কমতে কমতে ১৬ ফেব্রুয়ারি তা শূন্যে নেমে আসে। টানা ১২ ঘণ্টা কারখানা বন্ধ রাখতে হয় অনেক উদ্যোক্তাকে।
এন জেড টেক্স গ্রুপের কর্ণধার জানান,
“আমার নিজের কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫ কোটি টাকার উৎপাদন বন্ধ থাকে।”
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি আদেশ ঝুঁকিতে পড়ছে বলেও জানান শিল্প মালিকরা।
সরবরাহ কমে ঘাটতি প্রায় ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট
পেট্রোবাংলা-র তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ভাসমান দুই এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
১৬ ফেব্রুয়ারি সরবরাহ নেমে আসে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন,
“চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম থাকলে লাইনে গ্যাস জমিয়ে চাপ বাড়ানোর সুযোগ থাকে না। ছুটির দিনে চাহিদা কমলে ধীরে ধীরে চাপ বাড়ে। এখন ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানো হচ্ছে, তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েকদিন লাগবে।”
তিনি জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত গ্যাস লাইন পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে সময় প্রয়োজন, কারণ কর্মদিবসে চাহিদা আগেই তৈরি হয়ে যায়।
সমন্বয়ের অভাব নিয়ে প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন,
“দুটি এলএনজি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘাটতি মোকাবিলার প্রস্তুতি ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করায় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে। শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে হলে বিকল্প বা অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সরবরাহ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সূচিতে কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি।
শিল্পের সামনে অনিশ্চয়তা
গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রফতানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প—যা দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস—তা বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্প মালিকদের দাবি, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে।


