খুরশীদ আলম সরকার

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দেশের মাটিতে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-২০২০ ফ্লাইটে সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে প্রত্যাশা করছেন বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের নেতাকর্মীরা।
গণসংবর্ধনায় শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে রাজধানীর কুড়িলের ৩০০ ফিট এলাকায় ইতিহাসের অন্যতম বড় গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছে বিএনপি। দলটির দাবি, এ সংবর্ধনায় অন্তত ৫০ লাখ মানুষের উপস্থিতি ঘটতে পারে, যা অতীতের সব রাজনৈতিক সমাবেশের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। অনুষ্ঠানস্থলে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ, শেষ পর্যায়ে রয়েছে মঞ্চ ও সার্বিক প্রস্তুতি।
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি পাওয়ার পর আয়োজনে গতি বেড়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, এই গণসংবর্ধনা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় উপলক্ষ।
দেশজুড়ে আগমন, বিশেষ ট্রেন ও লজিস্টিক প্রস্তুতি
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সারা দেশে ১০টি রুটে চলবে স্পেশাল ট্রেন। কক্সবাজার থেকে পঞ্চগড়, খুলনা থেকে রাজশাহী—দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্পেশাল ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের মাধ্যমে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি কঠোরভাবে মানার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে গুলশান—কঠোর নিরাপত্তা বলয়
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশ এলাকায় আজ সন্ধ্যা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বেবিচক। পুলিশের পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েন থাকবে।
বিএনপির পক্ষ থেকেও নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে। পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।
পরিবারসহ প্রত্যাবর্তন, প্রথম গন্তব্য খালেদা জিয়া
তারেক রহমান বিজনেস ক্লাসে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা জারনাজ রহমানসহ পাঁচ সফরসঙ্গী নিয়ে দেশে ফিরছেন। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাবেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। এরপর তিনি সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন। সেখান থেকে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে এই প্রত্যাবর্তন
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর গ্রেপ্তার হয়ে ২০০৮ সালে চিকিৎসার নামে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান তারেক রহমান। দীর্ঘ এই সময় তিনি দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় থাকলেও সরাসরি দেশে উপস্থিত ছিলেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সরাসরি উপস্থিতি বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে নতুন গতি দেবে এবং নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি হবে। ঢাকা জনসমুদ্রে পরিণত হবে।”
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়; এটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শক্তির পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ এবং রাজপথের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৃহস্পতিবারের গণসংবর্ধনা কতটা শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ।


