নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) সূচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে সূচক শূন্য দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৫৩ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। আগের মাস ডিসেম্বরে এ সূচক ছিল ৫৪ দশমিক ২।
তবে সূচক কিছুটা কমলেও নির্মাণ ও সেবা খাতে সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ যৌথভাবে দেশের কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—এই চারটি প্রধান খাতের ওপর ভিত্তি করে মাসিক পিএমআই সূচক প্রকাশ করছে।
পিএমআই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বর্তমানে উচ্চ খরচ ও নগদ অর্থের সংকট ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে। কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মোট খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এছাড়া আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক খাতে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার স্থগিত রাখা, নতুন বিনিয়োগে অনীহা এবং ক্রেতাদের সতর্ক আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৌসুমি প্রভাব এবং আমদানির কারণে কিছু খাতে চাহিদাও কমেছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মার্চের পর বা নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সর্বশেষ পিএমআই সূচকগুলো অর্থনীতির সম্প্রসারণের গতি কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ধীর পুনরুদ্ধার এবং সতর্ক অর্ডার উৎপাদন খাতের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অর্থনীতিতে টেকসই আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশ
নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বর মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং নভেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
আজ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা
নতুন বছরের জন্য প্রণীত মুদ্রানীতি আজ বিকাল সাড়ে ৩টায় ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত ছয় মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে।
মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান, সুদের হার কাঠামো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় সহায়ক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এবারও বিদ্যমান নীতিকৌশলের ধারাবাহিকতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতিগত সুদের হার কমানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এ কারণে আগামী ছয় মাসেও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধির পর থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছায়, যা তার আগের মাস আগস্টে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।


