সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেনা কর্মকর্তাদের কারাগারে প্রেরণ: বিচারপ্রক্রিয়ায় নজির স্থাপন

পাঠক প্রিয়

গুম, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সেনা হেফাজতে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন কর্মকর্তাকে বুধবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজিরের পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত আইনি পদক্ষেপ, যা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত এক দশকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেসসহ আন্তর্জাতিক মহল বারবার এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার নামে গোপন অভিযানে যুক্ত ছিলেন, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা টার্গেট হয়েছেন। তাদের এই কর্মকাণ্ড দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এক সময়কার ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও রাজনৈতিকভাবে বিব্রত ও অজনপ্রিয় করে তুলেছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম. নজরুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ বুধবার সকালে মামলাটির শুনানি শেষে আদেশ দেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন—“রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে কোনো কর্মকর্তা যদি নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন, তবে তা রাষ্ট্রের নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।”

আসামিদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে ৪টি ধারায়: এক. গুম ও অবৈধ আটক, দুই. অমানবিক নির্যাতন, তিন. বিচারবহির্ভূত হত্যা, ও চার.মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা ও পরিকল্পনা।

রাজনৈতিক সংগঠন এবং মানবাধিকার সংগঠনসমূহ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সুফি সাগর সামস্ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন—“এটি প্রমাণ করে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সেনা বা বেসামরিক—যে-ই হোক, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও এই পদক্ষেপকে “দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের সূচনা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এই মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে—গুম, নির্যাতন বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো অপরাধে কোনো ছাড় থাকবে না। সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনা সম্ভব প্রয়োজনীয়। ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে সামরিক বাহিনীর মধ্যে মানবাধিকার প্রশিক্ষণ নৈতিক জবাবদিহি জোরদার করা হবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই রায় যদি দৃষ্টান্তমূলক হয়, তবে এটি বাংলাদেশের সামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার কেবল শাস্তির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধি ও আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই মামলার দৃষ্টান্তমূলক রায় ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা হয়ে থাকবে—ক্ষমতা নয়, ন্যায়ই সর্বোচ্চ।

তারিখ: ২২ অক্টোবর ২০২৫
প্রস্তুতকারক: [রিপোর্ট ডেস্ক]

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ