বিশেষ প্রতিবেদন

মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এ ধরনের ধারাবাহিক ও সংগঠিত হামলার নজির নেই—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন, এসব ঘটনার সময় সরকারের নীরবতা শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সংবাদ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার, সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ এবং গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষার আহ্বান।
‘গণ–অভ্যুত্থানের পর এমন ঘটনা কল্পনাও করিনি’
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “যেভাবে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানট একের পর এক আক্রান্ত হয়েছে, এ রকম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের পর আর হয়নি। একটি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই ও গণ–অভ্যুত্থানের পর এ ধরনের হামলা ঘটতে পারে—এটা আমাদের চিন্তার মধ্যেই ছিল না।”
তিনি বলেন, দেশে সংবাদমাধ্যমের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। সরকার নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে বলে মনে হলেও কে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার কোনো স্পষ্টতা নেই। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর ওপর হামলাগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বহুদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের নাম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছিল।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
হামলাকারীদের পরিকল্পনার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অজানা থাকার কথা নয়—এমন মন্তব্য করে আনু মুহাম্মদ প্রশ্ন তোলেন, কেন আগে থেকে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “এসব হামলার সময় সরকারের নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, সরকার কি কার্যত সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনাকারীদের প্রধান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছে? সরকার কি চায় দেশে আতঙ্ক তৈরি হোক, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা কোণঠাসা হয়ে পড়ুক এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চেষ্টা ব্যর্থ হোক?
ভিন্নমত দমনের রাজনীতি
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরের ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনু মুহাম্মদ বলেন, তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। “নূরুল কবীর আশির দশক থেকেই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। আজ অন্যায় ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বললেই মানুষকে ফ্যাসিবাদের দোসর বানানো হচ্ছে।”
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি?
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের পক্ষ থেকেই বহু তথ্য প্রকাশ হলেও হত্যাকারী কীভাবে দেশ ছাড়ল—সে প্রশ্নও তোলেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সরকার অনেক কথা বললেও হত্যাকারী ধরতে সক্রিয়তা দেখা যায়নি।
ত্বকী, সাগর–রুনি ও তনু হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আগের সরকারের মতোই এখনো আমরা নিষ্ক্রিয়তা ও ছলচাতুরির একই চিত্র দেখছি।”
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ডাক
এই পরিস্থিতিতে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তিনটি জায়গায় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন—
-
সংবাদমাধ্যমগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ
-
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী ঐক্য
-
নাগরিক সমাজের সব সংগঠনের সম্মিলিত প্রতিরোধ
তিনি জানান, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে শিগগিরই বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ছয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি উত্থাপন করা হয়—
-
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেপ্তার
-
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, নালন্দা বিদ্যালয়, ধানমন্ডি–৩২ ও ভালুকার দীপু চন্দ্র দাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার
-
নির্বাচন সামনে রেখে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
-
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ
-
দেশ–বিদেশের উসকানিদাতাদের শাস্তির আওতায় আনা
-
ওসমান হাদির জানাজার পর অস্থিতিশীলতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ
নাগরিক সমাজের কণ্ঠ
সংবাদ সম্মেলনে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, “ডেইলি স্টারের সঙ্গে আমার বহু দ্বিমত আছে, কিন্তু মতভিন্নতার জন্য কোনো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া আমি কখনো সমর্থন করি না।” তিনি সতর্ক করে বলেন, হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে যদি নিজেরাই সেই চরিত্র ধারণ করি, তবে তা হবে লজ্জাজনক ও বিপজ্জনক।
গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার বলেন, ধারাবাহিক হামলাগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরাতে বাধা দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক চাপের ফলেই কিছু অগ্রগতি হচ্ছে, তবে তা অনেক আগেই হওয়া দরকার ছিল।
গণতন্ত্রের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা একমত হন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ওপর হামলা শুধু কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়—এটি গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত।
নাগরিক সমাজের ভাষায়, এই পরিস্থিতিতে নীরবতা নয়—প্রয়োজন ঐক্য, প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি।


