বিশেষ প্রতিবেদক

জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশ হঠাৎ করেই তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি কার্যত ‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপার শামিল।
আগামী সোমবার থেকে নিউইয়র্কে পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠকে বসছে Committee for Development Policy (সিডিপি)। সেখানে বাংলাদেশের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার রূপরেখা নির্ধারণ হবে। তবে এখনই চূড়ান্ত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ আসছে না—সিদ্ধান্তে সময় লাগবে।
কেন ‘ক্রাইসিস বাটন’?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, যিনি সিডিপির এনহ্যান্স মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান, মনে করেন—সরকারের এই আবেদন ইএমএম কাঠামোর বিশেষ একটি বিধান সক্রিয় করার মতোই।
ইএমএম কাঠামোয় ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো দেশ যদি অপ্রত্যাশিত সংকট—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে—তাহলে উত্তরণ প্রক্রিয়া সাময়িক স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করতে পারে।
এর আগে এ সুযোগ ব্যবহার করেছিল Solomon Islands। সুনামি ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাদের উত্তরণ দুই-তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের আবেদন: প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন
বাংলাদেশের আবেদনটি পাঠানো হয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিবের পক্ষ থেকে। চিঠিটি গেছে United Nations Economic and Social Council (ইকোসক)-এর অধীন সিডিপির চেয়ারম্যান José Antonio Ocampo-এর কাছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—এটি সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন কি না। কারণ, কয়েক মাস আগেই একই দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, উত্তরণের প্রস্তুতি সন্তোষজনক।
বিশ্লেষকদের মতে, সিডিপি আগের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, সর্বশেষ তথ্য এবং নতুন আবেদনের যুক্তি—সব মিলিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে নভেম্বর মাসে সরকারের দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনের সঙ্গে বর্তমান আবেদনের তুলনা করা হবে।
কারা আছে ‘পাইপলাইনে’?
এ মুহূর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশ তিনটি—
-
Bangladesh
-
Nepal
-
Laos
নেপাল ও লাওস এখনো সময় বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি। ফলে বাংলাদেশের আবেদন মূল্যায়নের সময় তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় আসতে পারে।
এলডিসি উত্তরণের মানদণ্ড কী?
প্রতি তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করে সিডিপি। তিনটি সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় উত্তরণের যোগ্যতা—
-
মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI)
-
মানবসম্পদ সূচক (HAI)
-
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (EVI)
যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০২১ সালে সুপারিশ করা হয়, ২০২৪ সালে দেশটি এলডিসি তালিকা থেকে বের হবে। তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬-এ নির্ধারিত হয় (বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী ২৪ নভেম্বর চূড়ান্ত উত্তরণ)।
কেন সময় চাইছে বাংলাদেশ?
চিঠিতে দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা
-
রপ্তানি বাজারে চাপ
-
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট
-
উচ্চ মূল্যস্ফীতি
-
জলবায়ুজনিত ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত ও কোটা সুবিধা, বিশেষ সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের কিছু সুবিধা কমে যাবে। ফলে প্রস্তুতি যথেষ্ট না হলে অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগতে পারে।
সামনে কী?
সিডিপির বৈঠকে প্রথমে নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশের আবেদন কোন কাঠামো ও পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে। এরপর বিশ্লেষণ, তথ্য যাচাই ও তুলনামূলক পর্যালোচনার ভিত্তিতে সুপারিশ যাবে ইকোসকের কাছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের এই আবেদন আন্তর্জাতিক মহলে বার্তা দিয়েছে যে, উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, জাতিসংঘের মূল্যায়নে বাংলাদেশ সাময়িক সময় পায়, নাকি নির্ধারিত সময়সূচিই বহাল থাকে।


