অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি) নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অঞ্চলে, আর একক দেশ হিসেবে সর্বাধিক রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন, শুল্ক–সুবিধার অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি—সব মিলিয়ে সামনে কঠিন সময়ের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
মার্কিন বাজারে রপ্তানি কমেছে
পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে নিম্নগতি দেখা গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ শুল্ক ও অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে।
ইইউ বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে
একক অঞ্চল হিসেবে ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার; মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশই সেখানে যায়। তবে ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে ভারত যে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক দেয়, তা শূন্যে নেমে আসবে। এতে ইউরোপীয় বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
অন্যদিকে, ইইউ–ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের শুল্কও শূন্যে নেমে আসার কথা। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশকে একসঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বাড়তি প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে।
এলডিসি উত্তরণ ও শুল্কঝুঁকি
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ লাভ করবে। এর পর ২০২৯ সাল পর্যন্ত কিছু ট্রানজিশন সুবিধা থাকলেও, পরবর্তীতে ইইউতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থাকবে না—যদি না জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা যায় বা নতুন কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নতুন চুক্তি না হলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ সংকটও বাড়ছে
শুধু বৈদেশিক প্রতিযোগিতা নয়, দেশীয় চ্যালেঞ্জও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদনক্ষমতা ৩০–৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে—
-
উন্নত অবকাঠামোর ঘাটতি
-
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার
-
আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় দক্ষ শ্রমিকের অভাব
এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো অর্ডার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
বিজিএমইএর উদ্বেগ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি–এর (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,
“ইউরোপ আমাদের সর্ববৃহৎ বাজার। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশ ইউরোপে যায়। ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে তাদের বর্তমান শুল্ক শূন্য হয়ে যাবে। এতে তাদের সক্ষমতা অনেক বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, ভারত কটনের ওপর উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি দেয়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ে তারা এগিয়ে থাকবে। ইউরোপের বাজার ২০০–২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি; সেই বাজারে নিজেদের অংশ বাড়াতে ভারত ৩০–৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
করণীয় কী?
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দ্রুত ইইউর সঙ্গে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে আলোচনা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি—
-
দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ
-
জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা
-
উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন
-
স্বল্পসুদের অর্থায়ন সুবিধা বৃদ্ধি
এসব পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প তার দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই নতুন বাস্তবতায় দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত না নিলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।


