সিলেট প্রতিনিধি

ইউরোপে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে সিলেটের বহু তরুণ ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন। বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসার কঠোরতার সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারী দালাল ও মাফিয়া চক্র তাদের ফাঁদে ফেলছে। কেউ ভূমধ্যসাগরে স্বপ্ন হারাচ্ছেন, কেউ লিবিয়ার নির্যাতনকেন্দ্রে, আবার কেউ প্রতারক এজেন্সির কাছে সর্বস্ব খুইয়ে দেশে ফিরছেন হতাশা নিয়ে।
উদ্বেগজনক চিত্র
গত এক বছরে সিলেট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে মানব পাচার ও বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার ৪১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ—অনেকে লজ্জা, ভয় বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না।
দালালদের ফাঁদ ও বিপজ্জনক রুট
ইউরোপে যাওয়ার আশায় তরুণদের একটি বড় অংশ অবৈধ পথে যাত্রা করছে। প্রচলিত রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দুবাই হয়ে তুরস্ক, সেখান থেকে আলবেনিয়া–বসনিয়া–ক্রোয়েশিয়া হয়ে ইতালি
- লিবিয়া হয়ে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা
এই যাত্রাপথে দালালরা তরুণদের বিভিন্ন ধাপে মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অনাহার—সবই নিত্যদিনের ঘটনা।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা
জকিগঞ্জ উপজেলার এক তরুণ জানান, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে জিম্মি করে রাখা হয় এবং নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। পরিবারের ভিটে বিক্রি ও ঋণ করে তিনি প্রায় ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। নৌকায় করে ইতালির উদ্দেশে পাঠানোর পর পুলিশ দিয়ে আটক করানো হয়; জেল, নির্যাতন শেষে আবার অন্য মাফিয়ার কাছে বিক্রি। শেষ পর্যন্ত জানালা ভেঙে পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
বিয়ানীবাজারের আরেক যুবক জানান, ১০ দিনের মধ্যে বৈধভাবে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে দুবাই, তুরস্ক, আলবেনিয়া ও বসনিয়া ঘুরিয়ে ক্রোয়েশিয়া হয়ে ইতালিতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রায় ১৫ বার ব্যর্থ চেষ্টার পর ইতালিতে পৌঁছালেও সাড়ে ৯ মাসের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। তার ভাষায়, “এখন আমি পথের ফকির।”
প্রতারক এজেন্সির দৌরাত্ম্য
সিলেটের কিছু অবৈধ এজেন্সি ইউরোপে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা আইনি জটিলতা ও প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে অনেক সময় নীরব থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মত
আটাব সিলেটের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল বলেন, মানব পাচারের উদ্দেশ্যে সিলেটসহ সারা দেশে অসংখ্য অবৈধ এজেন্সি গড়ে উঠেছে। এগুলো দমন না করলে মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে বিপথগামী করা চলতেই থাকবে। কঠোর আইনি ব্যবস্থা জরুরি।
সিলেট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুস সাকিব বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে যাত্রাকারীরা শুরুতে বাস্তবতা বোঝেন না। যারা সফল হয়েছেন—তাদের গল্পই সামনে আসে; ব্যর্থদের কান্না শোনা যায় না। সচেতনতা বাড়ানোই ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।
করণীয় ও সুপারিশ
- বিদেশ যাওয়ার আগে এজেন্সির বৈধতা যাচাই (লাইসেন্স, বিএমইটি নিবন্ধন)
- লিখিত চুক্তি ছাড়া অর্থ লেনদেন না করা
- অবৈধ রুট ও ‘দ্রুত ভিসা’ প্রলোভন এড়িয়ে চলা
- মানব পাচারবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ
- ইউনিয়ন–উপজেলা পর্যায়ে জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার
ইউরোপের স্বপ্ন সিলেটের তরুণদের এগিয়ে নেওয়ার বদলে আজ অনেকের জীবনে দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরছে। বৈধ পথ, সচেতন সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রীয় নজরদারি—এই তিনের সমন্বয়ই পারে মানব পাচারের এই ভয়াবহ চক্র ভাঙতে।


