মোঃ সহিদুল ইসলাম:
ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর খুশি আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে মুসলিম জাহানের সর্বোবৃহৎ আনন্দোৎসবের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। পবিত্র রমজান মাসের কঠোর সাধনা ও আত্মোৎসর্গের পর শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের মুসলিম আনন্দ উদ্দীপনার মাধ্যমে ধনী- গরিব, আমীর- ফকির নির্বিশেষে সকলে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন।
ঈদ উপলক্ষে নাড়ীর টানে পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া- প্রতিবেশীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য মানুষ তাদের কর্মক্ষেত্র, অস্থায়ী বা স্থায়ী আবাস ছেড়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পাড়ি জমায় জন্ম ভিটায়। ঈদের এতবড় একটা ছুটিতে মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকেন এ সময়। এবার ঈদে প্রায় এক কোটি ৫০ লক্ষ লোক ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফিরতে আগ্রহী। দেশের অভ্যন্তরে কমবেশি প্রায় ছয় কোটি মানুষ যাতায়াত করবে। ফলে বাস, লঞ্চ, ট্রেন ও মোটরসাইকেল এর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ লোক শহর ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিদিন যানবাহনের ধারণক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ লক্ষ মানুষের। যার কারণে অতিরিক্ত যাত্রীর থাকবে এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবছর ঈদের সময় নৌ, স্থল ও ট্রেনের যানবাহন সংখ্যা যদিও বাড়ানো হয়, কিন্তু তারপরও যাত্রী তুলনায় তা খুবই কম।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) ঈদ উপলক্ষে ২৫ শে মার্চ হতে ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু করবেএবং তা চলবে আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঈদ উপলক্ষে রেলের বিদ্যমান আন্তঃনগর ট্রেনের সঙ্গে আরও ৪৪টি নতুন কোচ যুক্ত, প্রতিটি আন্তঃনগর রেলের আসনের অতিরিক্ত স্ট্যান্ডিং টিকিট এবং ১০টি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে।
সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে সারাদেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের হাইওয়ে ও ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। সারাদেশে ৩৯৯১ কিলোমিটার মহাসড়কের নিরাপত্তাছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ নৌ পুলিশ ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে বিশেষ নিরাপত্তায় কাজ করবেন।
প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে চলা মানুষের আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে সড়ক, নৌ ও ট্রেন দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রতিবছরই হারিয়ে যায় অনেক আপনজন। গত ঈদুল ফিতরের আগে- পরে যাতায়াতে ৩৯৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত ও ১৩৯৮ জন আহত হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আশঙ্কা এবারে ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা আরো বাড়তে পারে। সংগঠনটি বলেছে, এবারে ঈদে প্রায় ১১ হাজার বাসসহ প্রায় ৬ লক্ষ ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর যানবাহন চলাচল করবে। সর্বোপরি জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাও কমেছে।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি সড়ক পরিবহন ও সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদারকরণে নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা মোকাবেলায় গণসচেতনামূলক স্লোগান প্রণয়ন করেছেন। যেমন— “আইন মেনে সড়কে চলি, নিরাপদে ঘরে ফিরি।” “গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি।” ইত্যাদি। নিরাপদ সড়ক চাই এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমরা যখন সড়কে উঠবো তখন আমাদের লাইসেন্সসহ গাড়ি ঠিক আছে কিনা তা দেখে চেক করে গাড়িতে উঠবো। ইতিমধ্যে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। লিফলেট এর নিয়ম কানুন মেনে চলার চেষ্টা করব তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে এবং আমরা নিরাপদে বাড়িতে ফিরতে পারব।
বাংলাদেশে রাস্তাঘাট ও যানবাহন বৃদ্ধির সাথে সাথে দুর্ঘটনার হারও অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে নিহত ও আহতের সংখ্যা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যান সমিতি এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে ৮ হাজার আর সরকারি পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪ হাজারের বেশি। গবেষণা ও সচেতনামূলক প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এর তথ্য মতে গত বছর সারাদেশের ৬৯৮৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২৯৪ জন নিহত এবং ১২০১৯ জন আহত হয়েছেন। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলেছে দেশে বছরে প্রায় ২৩ হাজার ১৬৬ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। প্রতিদিন ইমারজেন্সিতে ৩০০ রোগী আসে তাদের মধ্যে ৪০% সড়ক দুর্ঘটনার রোগী। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের অধিকাংশের বয়স ১৮- ৪৫ বছরের মধ্যে। আর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ঈদের সময়। কারণ ঈদের সময় স্বাভাবিক যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপ থাকে।
ঈদুল ফিতর নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেছেন। যেমন- যাত্রীরা যেন পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ঈদের ভ্রমণ করেন, নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা সর্বদা বিবেচনায় রাখবেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ছাদে, ট্রাক, পিকাপ কিংবা অন্যান্য যাত্রীবাহী যানবাহনে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, রাস্তা পারাপারের জেব্রাক্রসিং, ফুট ওভারব্রিজ, যানবাহনের গতিবিধি দেখে নিরাপদ রাস্তা পার, অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কোন খাবার বা পানীয় নেয়া যাবে না, অদক্ষ, অপেশাদার, ক্লান্ত বা অসুস্থ চালককে যাত্রীবাহী বাস বা গাড়ি চালাতে দেয়া যাবে না। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং, ক্লান্তি বা অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি চালাবেন না। ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ গাড়ির প্রয়োজনে কাগজপত্র সর্ব অবস্থায় গাড়িতে রাখবেন। ট্রেনের ছাদে, বাফারে, পাদানিতে এবং ইঞ্জিনে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। বাসাবাড়ি থেকে বের হতে মূল্যবান গহনা, কাগজপত্র, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় রেখে যাওয়া , বিদ্যুতের সকল সুইচ, পানির কল বন্ধ করা, দরজা জানালা বন্ধ করে, চেক করে, প্রয়োজনে ঘরে সিসি ক্যামেরা লাগানো মূল দরজায় তালা লাগানো, চেক করা, বাসার চারপাশে লাইটের ব্যবস্থা করা, বাড়ির দারোয়ানকে সঠিক পরামর্শ, নির্দেশনা ও মোবাইল ফোন সংগ্রহ করা ইত্যাদি যথাযথ ব্যবস্থা করতে বলেছেন। সর্বঅবস্থায় সর্বসময় প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নিতে বলেছেন।
বেদনা বিধুর জীবনে ঈদ উৎসব এক নতুন প্রাণের ও নির্মল আনন্দ সৃষ্টি করে। ঈদুল ফিতরের দিন সকালবেলা অজু গোসল করত: পাক পবিত্র হয়ে নতুন বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে মিষ্টান্ন খেয়ে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে করতে ঈদের ময়দানে যাবেন এবং ফিরে আসবেন। নবীজি (সাঃ) এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন আর এক রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতেন। (জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা:); বোখারী। তাকবীর হলো: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”
ইনশাল্লাহ ঈদুল ফিতরে আমাদের সকলের প্রত্যাশা থাকবে, ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এবং সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। আমরা সকলে নিরাপদে ঘরে ফিরে এবং আবার কর্মস্থলে নিরাপদে ফিরে আসি। আমরা সবাই সালাম বিনিময়, মোসাফাহা, কুশল বিনিময়, বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা, ভাই বোন, পরিবার, শশুর- শাশুড়ি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিবো। এই আনন্দ আমাদের ভালো থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার ঈদ যাত্রা আনন্দময় ও নিরাপদ হোক এই কামনা করি। ঈদ মোবারক। ঈদ মোবারক।
লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।


