মঙ্গলবার, জুন ১৮, ২০২৪

অসম্পূর্ণ জাতীয় স্মৃতিসৌধ পুর্ণাঙ্গ করতে হবে

পাঠক প্রিয়

—– ড. সুফি সাগর সামস্

মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ঢাকা জেলার সাভার-নবীনগরে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের মধ্য দিয়ে সকল দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ও সাফল্যের যুগলবন্দি রচনা করা হয়েছে। ৭টি ত্রিভুজ আকৃতি মিনারের শিখর দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ৭টি পর্যায়ের প্রতিটি এক ভাবব্যঞ্জনায় রচনা করা হয়েছে।
এই স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজ আকৃতির দেওয়াল নিয়ে গঠিত। দেওয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশ বড়ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেওয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে নির্দেশ করে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই ৭টি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পরই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পাকিস্তানের পূর্ব-বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সাত কোটি মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তখন থেকেই বাঙালির সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপর পাকিস্তানি জান্তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তরুন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করা হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও তরুন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পূর্ববঙ্গ চষে বেড়ান। যুক্তফ্রন্ট ৩০৯ আসনের মধ্যে ২২৮টি আসন লাভ করে। শাসনতন্ত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ মূলত: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির অন্তরে স্বাধীনতার অগ্নি প্রজ্জ্বলন করে দিয়েছিলেন। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি শর্ত-সাপেক্ষে স্বাধীনতার আগাম ঘোষণা এবং গেরিলা যুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হলেন, স্বাধীনতার মহানায়ক।
স্বাধীনতা আন্দোলনের ৭টি ধারাবাহিক পর্যায়কে পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক কোথায়? কেন এই পরিক্রমায় মহানায়ককে রাখা হয়নি? তাঁকে না রাখার কারণে মূলত: স্মৃতিসৌধটি ত্রুটিপূর্ণ এবং অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার আমলেই নকশা আহŸান করা হয়। একই বছর জুন মাসে প্রাপ্ত ৫৭টি নকশার মধ্যে স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন প্রণীত নকশাটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই নকশার পরিক্রমায় মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাখা হয়নি। বঙ্গবন্ধুবিহীন নকশাটি জেনারেল জিয়া অনুমোদন দিয়েছিলেন। তিনি কী সম্যক জেনে বুঝেই এই নকশা অনুমোদন দিয়েছিলেন? নকশা নির্বাচনে সর্বদলীয় একটি জাতীয় কমিটি গঠন করার দরকার ছিল। এটা করা হলে নক্শা নির্বাচনের বিষয়টি এভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ হতো না।
প্রতি বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় দিবস উদযাপন করি। এ দিন দুটিতে জাতীয় স্মৃতিসৌধ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য করে আমরা শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। কিন্তু অতি দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, এই দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত!
মুক্তিযুদ্ধের যিনি মহানায়ক, স্বাধীনতার প্রশ্নে যিনি যৌবনের ১৪টি বছর জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন, ২৩টি বছর লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, যিনি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্যে বাঙালি জাতিকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এবং ঐক্যবদ্ধ করেছেন, সেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় না! একসঙ্গে সমগ্র জাতির শ্রদ্ধা নিবেদনের কোন স্থানও নেই। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ ত্রুটিমুক্ত করতে এবং জাতীয় ঐক্য পুনরায় গড়ে তুলতে ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ প্রাঙ্গণে ‘মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করতে হবে। এটা এই জন্য করতে হবে যে, যাতে সমগ্র জাতি একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন।
এভাবে যদি একসঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, তাহলে আমাদের একপক্ষের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি ও অমূলক বিদ্বেষ রয়েছে তা ধীরে ধীরে মুছে যাবে। এই জাতীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা একটি ভ্রাতৃত্বময় জাতীয় ঐক্যের পথে অগ্রসর হতে পারবো।

( লেখক, মহাসচিব, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি)।

সর্বশেষ সংবাদ

যমুনা ব্যাংক অন্যতম সেরা জলবায়ু ফোকাস ব্যাংক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রীনটেক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ২৪তম জাতীয় নবায়নযোগ্য শক্তি সম্মেলন এবং গ্রীন এক্সপো ২০২৪-এ যমুনা ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম...

প্রধানমন্ত্রীর প্যারিস সফরের সম্ভাবনা

ঢাকায় ফরাসি রাষ্ট্রদূত মারি মাসদুপুই আজ বলেছেন যে, বাংলাদেশ বিমানের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়ে এবং বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব সার্বভৌম পৃথিবী-পর্যবেক্ষন স্যাটেলাইট প্রদানের জন্য এয়ারবাস...

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণের পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। আকাশপথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য...

পুঁজিবাজারে নারীর সম্ভাবনা অপার: স্পিকার

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি বলেছেন, পুঁজিবাজারে জেন্ডার গ্যাপ দূর করতে হবে। তিনি বলেন, “পুঁজিবাজার একটা বিশেষায়িত ক্ষেত্র। পুঁজিবাজারে নারীর অংশগ্রহণের...

তিতাস গ্যাস গ্রাহকদের সুদিন ফিরছে

সরকারের সদিচ্ছা এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ মোল্লাহ নানামুখী সংস্কার মূলক কাজ হাতে নেওয়ায় তিতাস গ্যাসের গ্রাহকদের...

জনপ্রিয় সংবাদ

সিভি এবং চাকুরী আবেদনের কিছু প্রয়োজনীয় টিপস

মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করার বদৌলতে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখে পরতে হয়। যার অধিকাংশই আসে সিভিকে কেন্দ্র করে। আমি সিরিজ আকারে সিভি এবং ক্যারিয়ার...

মিথ্যা সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে তুরাগ থানা ছাত্রলীগ

তুরাগ থানা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মোঃ আরিফ হাসান জানায়, গত ১১-০৮-২০২০ তারিখে ’আমার প্রাণের বাংলাদেশ’ নামক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘রাজধানীর উত্তরা যুবলীগ নেতা নাজমুল হাসান...

 ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট পদে নিয়োগ জোরদার করলো মেটলাইফ বাংলাদেশ

ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট হিসেবে যোগদানে আগ্রহী প্রার্থীদের জন্য ডিজিটাল নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন করেছে মেটলাইফ বাংলাদেশে। অনন্য এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আগ্রহী প্রার্থীদেরকে বাসা থেকেই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে...

২৩ কোটি বছরের পুরনো হিরকখণ্ড উদ্ধার!

দেখতে কি সুন্দর হিরকখণ্ডটি । শুক্রবার রাশিয়ার অ্যানাবার নদীর ধারে আলরোসার এবেলিয়াখ খনি থেকে উদ্ধার হয় এই হিরক খণ্ডটি। এখনও স্থির হয়নি হিরকখণ্ডটি পালিশ...