বিশেষ প্রতিবেদন

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে। কৌশলগত জলপথ Hormuz Strait ঘিরে নিরাপত্তা সংকট এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহন প্রায় থমকে গেছে। একই সঙ্গে ইউরোপমুখী রপ্তানির খরচও বাড়ছে, ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের বাড়তি সারচার্জ—সব মিলিয়ে আমদানি-রপ্তানি খাত এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি প্রায় বন্ধ
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে সবজি ও তৈরি পোশাকের মতো দ্রুত সরবরাহযোগ্য পণ্য পাঠানো প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানান, অনেক শিপিং লাইন উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (Bangladesh Knitwear Manufacturers and Exporters Association)–এর সভাপতি Mohammad Hatem বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন সময় অন্তত ১০ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
ইউরোপে রপ্তানিতেও বাড়তি সময় ও খরচ
সংকটের কারণে অনেক জাহাজ সরাসরি উপসাগরীয় রুট ব্যবহার না করে বিকল্প সমুদ্রপথে চলাচল করছে। এতে ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো জাহাজে থাকা মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনারের ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকি বাড়ায় বিমা প্রিমিয়ামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রপ্তানি পণ্যের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন
বিমান পরিবহনেও সমস্যার মুখে পড়েছে রপ্তানি খাত। পোশাক শিল্পে ক্রেতাদের সঙ্গে জরুরি নথিপত্র বিনিময়, নমুনা পণ্য পাঠানো এবং ডিজাইন অনুমোদনের মতো কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের সঙ্গে উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ব্যাহত
শুধু পরিবহন নয়, জ্বালানিসংকটও উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ পড়েছে।
অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানাগুলো জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডিজেলের ঘাটতির কারণে জেনারেটর চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে অনেক গার্মেন্টস কারখানায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উৎপাদন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তেলের দাম বাড়লে বাড়বে আমদানি ব্যয়
ব্যবসায়ীরা জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এটি বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ।
এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (Dhaka Chamber of Commerce and Industry) জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে এবং বাণিজ্য ঘাটতিও সম্প্রসারিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ছোট ও মাঝারি শিল্পে ঝুঁকি
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুফি সাগর সামস্ বলেন, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, বাড়তি পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে ছোট ও মাঝারি শিল্পে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনের ওপর একটি নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


