বিশেষ প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা নিয়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত বর্তমান সংসদ স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়নি; বরং রাষ্ট্রপতির একটি আদেশের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা ওই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও এখন পর্যন্ত সেই অধিবেশন ডাকা হয়নি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের অধীনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই পরিষদ গঠন হয়নি। তিনি দাবি করেন, বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য ইতোমধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংসদ সদস্য ও পরিষদের সদস্য—দুই দায়িত্ব পালনের সুযোগ চান তারা।
তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশন যেভাবে আহ্বান করা হয়, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও আহ্বান করা সম্ভব। সেই প্রক্রিয়ায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো সাংবিধানিক অস্তিত্ব নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন না এবং রাষ্ট্রপতিরও অধিবেশন আহ্বানের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩(১)(ক) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয় কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা যায় না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫” কোনো অধ্যাদেশও নয়, আবার প্রচলিত অর্থে আদেশও নয়। এর আইনি অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
এ সময় তিনি সংসদীয় বিধি অনুযায়ী নোটিশ ছাড়াই বিরোধীদলীয় নেতাকে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংসদীয় বিধি অনুযায়ী নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা শুরু
এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সাধারণ আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংসদে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দাবি জানান।
সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশন এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
স্পিকারের সতর্কবার্তা
অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার ধরন নিয়েও মন্তব্য করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে কাগজ দেখে পুরো বক্তব্য পড়ে শোনানো অনুমোদিত নয়। সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে না দেখে বক্তব্য দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ বিন সাঈদী ও ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহকে উদ্দেশ করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ বিশেষ কমিটিতে
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
চিফ হুইপের প্রস্তাব অনুযায়ী বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করতে হয় এবং অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো পাস না হলে আইনি বৈধতা হারায়।
উল্লেখ্য, সংসদ কার্যকর না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এসব অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন।


