অনলাইন ডেস্ক

ঢাকা: পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিবার-পরিজনের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে চলতি মার্চের প্রথমার্ধেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
রিজার্ভে দৃশ্যমান উন্নতি
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মার্চে:
- মোট রিজার্ভ: ২৫.৪৪ বিলিয়ন ডলার
- বিপিএম-৬ রিজার্ভ: ২০.৩০ বিলিয়ন ডলার
অর্থাৎ, এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ও আমদানি সক্ষমতা
মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী:
- ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ: প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার
- মাসিক আমদানি ব্যয়: গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার
এই হিসাবে বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কমপক্ষে ৩ মাস) অনুযায়ী নিরাপদ অবস্থান নির্দেশ করে।
নীতিগত পরিবর্তনে ঘুরে দাঁড়ানো রিজার্ভ
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর:
- রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি কমানো হয়
- হুন্ডি ও অর্থপাচার রোধে নজরদারি বাড়ানো হয়
- বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা হয়
নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে নেওয়া এসব পদক্ষেপে ধীরে ধীরে রিজার্ভ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। বর্তমানে রিজার্ভ ৩৩–৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে।
ডলার বাজারে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন:
- ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে
- ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
- এ কারণে বাজারে ভারসাম্য রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে।
অতীতের চাপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ:
- ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়
- পরে অর্থপাচার, ঋণ অনিয়ম ও আমদানি চাপের কারণে কমতে থাকে
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়:
- মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলার
- ডলারের বিনিময় হার বেড়ে ১২০ টাকার বেশি হয়
পরিস্থিতি সামাল দিতে:
- আমদানি নিয়ন্ত্রণ
- ডলার বাজারে হস্তক্ষেপ
- রেমিট্যান্স বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়
রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনে:
- রেমিট্যান্স এসেছে ২২০ কোটি ডলার
- যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫.৭% বেশি
সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত:
- ফেব্রুয়ারি: ৩০২ কোটি ডলার
- জানুয়ারি: ৩১৭ কোটি ডলার
- ডিসেম্বর: ৩২২ কোটি ডলার
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে:
- বড় বিনিয়োগ না থাকায় আমদানি চাপ কম ছিল, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে
- নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে
- ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে, ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে
তবে:
- অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ
- রপ্তানি আয় বৃদ্ধি
- প্রবাসী আয় ধরে রাখা
এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ডলার সংকটের আশঙ্কা কম থাকবে।
ঈদকে ঘিরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে পুনরায় শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। নীতিগত নিয়ন্ত্রণ, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা জোরালো।


