অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা বিচ্ছিন্নতা কাটাতে নতুন এক আঞ্চলিক জোটের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ‘হেক্সাগন’ (ষড়ভুজ) আকৃতির এই জোটের ধারণা তুলে ধরে বলেন, ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসসহ কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বলয় গঠন করা হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই জোটের লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত ‘উগ্র সুন্নি ও শিয়া অক্ষ’-এর বিপরীতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা এবং ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব মোকাবিলা করা।
এখনো নেই আনুষ্ঠানিক সমর্থন
তবে ঘোষণার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহলে সংশয় দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি।
বিশেষ করে গ্রিস ও সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য হওয়ায় বিষয়টি আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে—যা সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর জন্য স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এই পরিকল্পনাকে ‘ব্র্যান্ডিং এক্সারসাইজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়; বরং বিদ্যমান কিছু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে বড় করে দেখানোর কৌশল।
ভারত কি যুক্ত হবে?
ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন নয়াদিল্লি ঐতিহাসিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকে সরাসরি যুক্ত হওয়া এড়িয়ে চলে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ ও ইরানের সঙ্গে ভারতের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। ফলে ‘অক্ষ বনাম অক্ষ’ ভিত্তিক জোটে ভারত সরাসরি নাম লেখাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরেও অনিশ্চয়তা
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে রূপ নেয়নি। একই সঙ্গে গ্রিস সম্প্রতি তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক সংলাপ জোরদার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হতে অনেক দেশই অনাগ্রহী থাকতে পারে।
দেশীয় রাজনীতির চাপ
নেতানিয়াহু বর্তমানে দেশীয় রাজনীতিতেও চাপে রয়েছেন। বিচার বিভাগীয় সংস্কার, কট্টরপন্থি ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিতর্ক এবং দুর্নীতির মামলাগুলো তাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রেখেছে।
সমালোচকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে নিজেকে শক্তিশালী বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই ‘হেক্সাগন জোট’ ধারণা সামনে আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে
টানা যুদ্ধাবস্থা ও সামরিক ব্যয়ের চাপ ইসরায়েলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো পূর্বাভাস কমিয়েছে বলে জানা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, প্রস্তাবিত জোট বাস্তবায়নের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত ‘হেক্সাগন’ জোট মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তন আনবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কাগুজে প্রস্তাব হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা


