বিশেষ প্রতিবেদন

দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অহিংস গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে দলীয় আধিপত্য, টেনশন, প্রতিদ্বন্দ্বী দমন এবং অন্তঃকোন্দল মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ সহিংস পরিস্থিতি। চলতি বছরের মাত্র ১০ মাসেই রাজনৈতিক কারণে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০৯ জন। সামগ্রিক চিত্র আরও ভয়াবহ—গত ১৪ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে কমপক্ষে ২৮১ জনের।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)–এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সহিংসতার এই উদ্বেগজনক তথ্যচিত্র।
টার্গেট কিলিং বাড়ছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী কেবল টার্গেট কিলিং–এর মাধ্যমেই নিহত হয়েছেন অন্তত ৪০ জন রাজনৈতিক নেতা–কর্মী।
এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—
-
স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার
-
পুরনো রাজনৈতিক শত্রুতা
-
দখল–বিরোধ
-
অপরাধচক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ
-
ক্ষমতার পরিবর্তন পরবর্তী প্রতিশোধ রাজনীতি
১৪ মাসে ১৭১ দুষ্কৃত হামলা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের ওপর কমপক্ষে ১৭১টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়কালে:
-
নিহত: অন্তত ১২০ জন
-
আহত: দুই শতাধিক
নিহতদের বড় অংশই বিএনপির নেতা–কর্মী। ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও দমন–পীড়নের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
২৮১ জনের প্রাণহানি—অধিকাংশই দলীয় অন্তঃকোন্দল
১৪ মাসের সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৮১ জন।
চমকপ্রদ তথ্য হলো—এই প্রাণহানির বড় অংশই ঘটেছে দলীয় অন্তঃকোন্দলের কারণে।
বিভিন্ন দলই অভ্যন্তরীণ বিরোধ, প্রভাব বিস্তার, আর্থিক বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘর্ষের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যেই প্রাণঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও ভয়াবহ মৃত্যু
মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—
-
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও রাজনৈতিক সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
-
তখন নিহতদের বড় অংশ ছিল আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী।
-
অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে
-
আধিপত্য বিস্তার
-
স্থানীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
-
নির্বাচনী এলাকায় প্রভাব তৈরির লড়াই
কে কেন্দ্র করে।
-
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ভূমিকা বদলেছে—একসময় ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন বিরোধী দলীয় শক্তির হাতে, আর এখন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বিএনপি–জোটনির্ভর রাজনীতিকেরা।
কেন বাড়ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এ বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ হলো—
১. দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
সহিংস ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত না হওয়া, শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
২. রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি
ক্ষমতার পালাবদল মানেই প্রতিশোধ—এই ট্রেন্ড দীর্ঘদিনের। প্রতিদ্বন্দ্বী দমন রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে।
৩. দলীয় কাঠামোর অবক্ষয়
যুব সংগঠন, অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে অস্ত্রবাজ গ্রুপ, দখল গোষ্ঠীর আধিপত্য বাড়ছে।
৪. অর্থনৈতিক স্বার্থ ও এলাকা–কেন্দ্রিক দখলদার রাজনীতি
স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায়। এতে সংঘর্ষ বাড়ছে।
৫. নির্বাচনের প্রাক–উত্তেজনা
নির্বাচনী বছরগুলোতে সহিংসতা সাধারণত বেড়ে যায়। মাঠ দখল, ভোটার নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সহিংসতাকে উসকে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ—
-
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
-
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
-
টার্গেট কিলিংয়ের মতো শঙ্কাজনক প্রবণতা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
-
রাজনৈতিক নেতা–কর্মীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।
তাদের সুপারিশ—
-
সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত
-
রাজনীতিতে অস্ত্রহীন সংস্কৃতি তৈরি
-
দলীয় কাঠামোতে শুদ্ধি–প্রক্রিয়া
-
স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত প্রতিরোধে নজরদারি
-
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বর্তমানে একটি সংবেদনশীল এবং সহিংসতার মুখোমুখি বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। গণতন্ত্র, নির্বাচনের পরিবেশ, এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা—সবই এই সহিংসতার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।


