নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ প্রশাসন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার যুক্তিতে একযোগে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ সুপার (এসপি) ও বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ব্যাপক অদলবদল করা হয়েছে। তবে হঠাৎ করেই লটারির মাধ্যমে এসব বদলি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
লটারিতে পদায়ন—কর্মকর্তাদের ভিতরে-বাইরে অস্বস্তি
সরকার রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাব এড়াতে শুরুতে পুলিশের বদলি লটারি পদ্ধতিতে করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে একই পদ্ধতিতে ইউএনওদের পদায়নও সম্পন্ন হয়। কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, অনেককে জোর করেই নতুন কর্মস্থলে পাঠানো হয়েছে, ফলে প্রশাসনের ভিতরে অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও অপরাধ পরিস্থিতি অঞ্চলভেদে ভিন্ন। ফলে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিবেচনা না করে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করলে প্রশাসনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।
লটারির ধরন নিয়েও প্রশ্ন
লটারির প্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ—
-
এসপি পদে লটারি করা হলেও ডিসিদের নিয়োগে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি—কারণ কী, তা অস্পষ্ট।
-
দেশের জেলার ওসিদের জন্য একবার লটারি হলেও মহানগর এলাকার জন্য আলাদা লটারি করা হয়েছে—যা নিয়ে অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
-
অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংবেদনশীল জেলায় দক্ষ কর্মকর্তাদের রাখা বা পাঠানোর বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত: লটারিভিত্তিক নিয়োগ ‘টেকসই সমাধান নয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, লটারির ওপর নিয়োগ ও বদলি নির্ভর করাটা কোনোভাবেই ভালো অনুশীলন নয়।
তাঁর মূল্যায়ন—
-
লটারির মাধ্যমে পদায়ন গঠনমূলক উদাহরণ তৈরি করে না।
-
এটি ইঙ্গিত করে যে সরকার বা কর্তৃপক্ষ যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
-
বিভিন্ন অঞ্চলে অপরাধের ধরন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আলাদা; তাই ওই এলাকার চাহিদা ও কর্মকর্তার দক্ষতা বিবেচনায় পদায়ন হওয়া উচিত।
-
অতীতে যেসব ক্ষেত্রে লটারিভিত্তিক পদায়ন করা হয়েছে, তার ফলাফলও ইতিবাচক হয়নি।
আসন্ন নির্বাচন ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
সরকারের যুক্তি হলো—নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখতে রাজনৈতিক চাপ বা তদবিরমুক্ত সিদ্ধান্তই এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। তবে প্রশাসনের ভেতরের অনেকে মনে করছেন, লটারিভিত্তিক বদলি যতটা নিরপেক্ষতা আনে, তার চেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা ও অদক্ষতার ঝুঁকি তৈরি করে।
নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসন সাজানোর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে লটারির মাধ্যমে অদলবদল নিয়ে প্রশ্ন, অসন্তোষ ও বিতর্ক দেখাচ্ছে যে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ, যুক্তিযুক্ত এবং দক্ষতাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। নীতি ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে প্রশাসনের কার্যক্রম ও নির্বাচন দুটিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।


