
বিশেষ প্রতিবেদক : আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৪ কিংবা ৭ ডিসেম্বর—এই দুই তারিখের যেকোনো একদিন তফসিল প্রকাশের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। এরই অংশ হিসেবে ১৮ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে ইসি, যা এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে বাগেরহাটের আসন পুনর্বহালের রায় এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত আরও প্রায় ৩০টির বেশি আবেদন আদালত পর্যন্ত যাওয়ায় নির্বাচনের সময় সীমানা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে প্রার্থী ও ভোটারের মধ্যে। ইসি সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আদেশের কপি (সার্টিফায়েড কপি) ইসি পেলে করণীয় ঠিক করবে কমিশন। তবে সংসদীয় আসনের জটিলতার মীমাংসায় বিলম্ব ঘটলে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় প্রভাব পড়বে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রায় শেষের পথে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে ১৮ নভেম্বর। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এখন শেষ ধাপের সংলাপ চলছে। এ ছাড়া ১৮ নভেম্বর পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামে অ্যাপ উদ্বোধন করা হবে। এরপর প্রবাসী, ভোটের দায়িত্বে সরকারি চাকরিজীবী ও কয়েদিরা নিবন্ধন করতে পারবেন। এজন্য ১০ লাখ দেশের অভ্যন্তরে এবং ১০ লাখ প্রবাসী নিবন্ধন করতে পারেন- এমনটি ধরে নিয়েই ব্যালট পেপার ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে আরও ছাপানোর জন্য থাকছে প্রস্তুতিও। এদিকে চলছে নির্বাচনি প্রশিক্ষণও।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, নতুনদের নিয়ে এখন দেশের ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ১২ হাজার ৩৮৪ জন। তিনি বলেন, আমরা চূড়ান্তভাবে ভোট কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করেছি। মোট ৬৪টি জেলার ৩০০টি সংসদীয় আসনে কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২,৭৬১। কক্ষের হিসাবে পুরুষদের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৭ এবং মহিলাদের জন্য ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০২ কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট কক্ষের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯। এদিকে নির্বাচন কমিশন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলকে (মার্কসবাদী) নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি সপ্তাহেই নিবন্ধনের চূড়ান্ত সনদ দেবে ইসি।
ফেব্রুয়ারিতে ভোট—দুটি সম্ভাব্য দিন
ইসি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী বছরের ৫ অথবা ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সংস্থাটি সব প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবহাওয়া, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই দুই দিনের যেকোনো একটিকে চূড়ান্ত করা হবে।
ইসির এক কর্মকর্তা জানান, “সংসদ নির্বাচনের জন্য আমাদের মূল প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এখন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, মাঠ প্রশাসনের ইনপুট এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে ভোটের দিন ঠিক করা হবে।”
নতুন চ্যালেঞ্জ: সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে
সরকার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ায় ইসিকে নিতে হচ্ছে বাড়তি প্রস্তুতি। গণভোটের ব্যালট ডিজাইন, আলাদা গণনা পদ্ধতি, ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত বুথ স্থাপন, জনবল বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়—সবকিছুই এবার প্রথমবারের মতো একসঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, একই দিনে দুটি বড় জাতীয় প্রক্রিয়া পরিচালনা করা একটি বড় আয়োজন। এতে লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনাগত চাপ বাড়বে, তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দেশীয় সক্ষমতার সমন্বয়ে এটি সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
১৮ নভেম্বর প্রকাশ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচনের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এবার নতুন তালিকায় প্রায় ২১ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিজিটাল ভোটার তালিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইসিটি বিভাগের সহায়তায় বিশেষ সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও নজরে
নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা–সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। বড় দুই জোটের অবস্থান, ছোট দলগুলোর কৌশল এবং আন্দোলন–রাজনীতি নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ইসির অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে কিনা, সেনাবাহিনীকে কোন ভূমিকা দেওয়া হবে, আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ মোতায়েন এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক দল নিয়েও আলাদা পরিকল্পনা নিচ্ছে কমিশন।
ইসির এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, “নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে প্রতিটি কেন্দ্রে দ্বিগুণ চাপ থাকবে। তাই আমরা বিশেষ মোতায়েন পরিকল্পনা তৈরি করছি।”
তফসিল ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইসির প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের চ্যালেঞ্জ সামনে থাকলেও কমিশন আশাবাদী যে, নির্ধারিত সময়ে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হবে নির্বাচনী উত্তাপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা।


