বিশেষ প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে। যুদ্ধের সপ্তম দিনে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ বোমা হামলা এবং ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে পুরো অঞ্চল জুড়ে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক।
শুক্রবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোর ওপর শক্তিশালী বাংকারবিধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করেছে। একই সময়ে ইরানও নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
তেহরানে বি-২ বোমারু বিমানের হামলা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার লক্ষ্য করে ডজনখানেক ২ হাজার পাউন্ডের ‘পেনিট্রেটর’ বা বাংকারবিধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, এসব বোমা বিশেষভাবে তৈরি, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের ওপর বোমা হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে।
বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দর বেন গুরিয়ন, হাইফা এবং তেল আবিবে হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে। রাজধানী তেল আবিব, হাইফা বন্দর এবং পূর্ব জেরুজালেমেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এই হামলায় প্রথমবারের মতো ক্লাস্টার মিসাইল ব্যবহার করেছে ইরান, যা একসঙ্গে বিস্তৃত এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা
আইআরজিসি জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে—
-
কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে
-
জর্ডানের ইরবিদ শহরের দিকে ড্রোন ছোড়া হয়েছে
-
কুয়েত উপকূলে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে
এই হামলায় ট্যাংকারটিতে আগুন ধরে যায় বলে দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।
নিহত ১,৩৩২ জন, ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো স্থাপনা
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে হামলায়—
-
৩,০৯০টি বাড়ি
-
৫২৮টি বাণিজ্যিক ও সেবাকেন্দ্র
-
১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র বা ওষুধ কারখানা
-
রেড ক্রিসেন্টের ৯টি স্থাপনা
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মোট ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
ব্রিটিশ সাময়িকী টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“আমাদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় লক্ষ্য—ইরান কোনোভাবেই যেন পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে। চতুর্থ লক্ষ্য হলো তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা।”
অন্যদিকে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি জানিয়েছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং নতুন অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কুয়েতে দূতাবাস খালি করছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতির অবনতির কারণে কুয়েতে অবস্থিত দূতাবাস খালি করার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কর্মীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দূতাবাস ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গোপন তথ্য ধ্বংস ও সার্ভারের ডেটা মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
লেবাননে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা
ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৬৮৩ জন।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার আশঙ্কায় হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পারস্য উপসাগরে আটকা ৫২ ফরাসি জাহাজ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরে ৫২টি ফরাসি জাহাজ আটকা পড়েছে বলে জানিয়েছে ফ্রান্স।
দেশটির পরিবহনমন্ত্রী ফিলিপ তাবারো বলেন, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে থাকা জাহাজগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ
যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এই পথ দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকায় ২৪৫ ফ্লাইট বাতিল
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আরও ৩৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট ২৪৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
কুয়েতের ৪টি
-
এয়ার অ্যারাবিয়ার ৬টি
-
কাতারের ৪টি
-
ইউএস-বাংলার ৫টি
-
এমিরেটসের ৪টি
-
বিমান বাংলাদেশের ২টি
-
বাহরাইনের ২টি
ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় এসব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।


