শুক্রবার, মে ১, ২০২৬

ইরানের সস্তা ড্রোনে চাপে যুক্তরাষ্ট্র: মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও হিমশিম খাচ্ছে

পাঠক প্রিয়

বিশেষ প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত নতুন এক সামরিক বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ইরানের তুলনামূলক সস্তা কিন্তু ব্যাপকসংখ্যক ড্রোন হামলা। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরান হাজার হাজার “ওয়ানওয়ে অ্যাটাক ড্রোন” মোতায়েন করছে। এই বিপুল সংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব নয়। ক্যাপিটল হিলে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশ ড্রোন ভূপাতিত করতে পারলেও সবগুলো ঠেকানো সম্ভব নয়।

সস্তা ড্রোন বনাম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হচ্ছে খরচের পার্থক্য। ইরানের অনেক ড্রোনের দাম কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার ডলার হলেও সেগুলো প্রতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে হচ্ছে লাখ থেকে মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধের ছয় দিনে ক্ষতি ২০০ কোটি ডলারের বেশি

তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির এক জরিপ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

প্রথম দিনেই কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলবশত গুলিতে তিনটি এফ–১৫ স্ট্রাইকিং ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার।

বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল ও বিভিন্ন স্থাপনায়ও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-রুয়াইস শিল্পনগরীতে মোতায়েন করা থাড অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার অংশ ধ্বংসের দাবিও করেছে ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলার বিস্তার

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত তিনটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে এসব হামলার কারণে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছে ইরানের তাসনিম নিউজ। একই সময়ে কাতারের রাজধানী দোহায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে মার্কিন দূতাবাসের আশপাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।

পাল্টা আঘাত অব্যাহত রাখার ঘোষণা তেহরানের

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কূটনৈতিকভাবে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা আঘাত ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

একই অবস্থান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অভিযান চালিয়ে যাবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান কেবল সেই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করছে যেখান থেকে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যুদ্ধ আট সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, চলমান সংঘাত সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তার দাবি, কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আকাশসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।

যুদ্ধ থামানোর আহ্বান

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ওমান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, “চলুন, এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ করি।”

ইউরোপে মতভেদ

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা নিয়ে ইউরোপেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো শানসেজ যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, ইরাক যুদ্ধের মতো এই সংঘাতও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়ার আশা করছে মাদ্রিদ।

সামরিক সহায়তা পাঠাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় অস্ট্রেলিয়া ও ইতালি ইতোমধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অঞ্চলটিতে বিশেষ দল ও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও উপসাগরীয় দেশগুলোতে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

নতুন ধরনের যুদ্ধের বাস্তবতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে—যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী বাহিনীও সস্তা কিন্তু বিপুলসংখ্যক ড্রোন হামলার মুখে বিপাকে পড়তে পারে।

ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশল, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক ব্যয়ের হিসাব নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বশক্তিগুলো।

 

 

 

সর্বশেষ সংবাদ

ময়মনসিংহ ও সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক দেশের দুই অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য এই দুর্যোগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০...

ডিএমপিতে পাঁচ পরিদর্শক বদলি

অনলাইন ডেস্ক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচজন পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. আমীর খসরুর স্বাক্ষরিত এক আদেশে...

যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে চীন—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

অনলাইন ডেস্ক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানকে নতুন করে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন—এমন তথ্য দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন...

হামের প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত ১৬৯

অনলাইন ডেস্ক দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫...

কাতারে ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদিও...

জনপ্রিয় সংবাদ