ইব্রাহিম খলিল বাদল

সোহেল নামে একজন নাগরিকের জীবনদৃষ্টান্ত বাংলাদেশে অসংখ্য রোগী ও তাদের পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতার ছবি ফুটিয়ে তোলে। তিনি মাসিক ৭৫ হাজার টাকার বেতনে রাজধানীর উত্তরায় দুই সন্তান, স্ত্রী ও ক্যানসারে আক্রান্ত মাকে নিয়ে বসবাস করেন। তার মা নিয়মিত ক্যানসার সাপোর্টিভ কেয়ারের একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ পেগফিলগ্রাস্টিম ব্যবহার করেন।
গত বছর এই ওষুধের দাম ছিল ৮,০০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫,০০০ টাকায়। সোহেলসহ অসংখ্য পরিবার এ ধরনের ব্যয়বহুল ওষুধের বোঝা সামলাতে পারছে না এবং ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। সোহেল বলেছেন, “না খেয়ে থাকা যায়, কিন্তু একজন মুমূর্ষু রোগীকে ওষুধ না দিয়ে কি বাঁচানো যায়?”
ক্যানসারের বিস্তার ও মৃত্যুহার
-
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১,৬৭,২৫৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়।
-
একই সময়ে ১,১৬,৫৯৮ জন মারা যায়, যাদের অধিকাংশই বিনা চিকিৎসা বা চিকিৎসা途中 বন্ধ করার কারণে মৃত্যুবরণ করে।
দেশীয় উৎপাদনের অগ্রগতি
পাঁচদশক আগে, বাংলাদেশে ক্যানসারের ওষুধ প্রায় পুরোপুরি বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৫ বছর আগে বিদেশি ওষুধের জন্য বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতো। বর্তমানে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ক্যানসারের ওষুধের প্রায় ৯৫% চাহিদা পূরণ করছে।
তবে দেশি উৎপাদনের ওষুধের দাম এখনও জনগণের নাগালের বাইরে। উদাহরণস্বরূপ:
-
পেগফিলগ্রাস্টিম: বাংলাদেশে ১০,০০০–২০,০০০ টাকা, ভারতের বাজারে ২,০০০ টাকা।
-
অ্যানাফ্লেক্স ম্যাক্স-৫০০: ১০ টাকা থেকে বেড়ে ২১ টাকা।
-
মারভ্যান-১০০ মিলিগ্রাম: ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির কারণ
বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
-
সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যর্থতা: ঔষধ প্রশাসনের অধীনে দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণহীনতা।
-
কোম্পানির সিন্ডিকেট: বাজার নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়।
-
কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়: ডলারের মান বৃদ্ধির সঙ্গে খরচের বৃদ্ধিও যুক্ত, যদিও বাস্তবে উৎপাদন খরচ অনেক কম।
বাজারে বৈষম্য
একই ওষুধের দাম বিভিন্ন ফার্মেসিতে ভিন্নভাবে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিলক্যাল ট্যাবলেটের খুচরা মূল্য ৬০০ টাকা হলেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৫–১০ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একই ওষুধ ৫৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
সরকার আগস্টে ২৬০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বাজারে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতে ওষুধের প্রভাব
-
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৪৪ টাকা ওষুধের জন্য ব্যয় হয়, যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ১৫%।
-
২০২২ সালের খানা আয়ব্যয় জরিপে দেখা যায়, ৬১ লাখ মানুষ ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদন এবং দেশীয় শিল্প অগ্রগতির পরও সাধারণ মানুষ ও ক্যানসার রোগীদের জন্য ওষুধের মূল্যমান এবং নাগাল সঠিক পর্যায়ে নেই।
-
মূল চ্যালেঞ্জ: নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেটের প্রভাব, এবং তত্ত্বাবধায়ক সংস্থার অকার্যকারিতা।
-
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
-
ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর নজরদারি।
-
সিন্ডিকেট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ।
-
রোগী বান্ধব নীতি, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ সকলের নাগালে আসে।
-
অনলাইন ও স্থানীয় ফার্মেসিতে মূল্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
-
সোহেলের মতো অসংখ্য পরিবার প্রতিনিয়তই এই সমস্যার মুখোমুখি। রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া ক্যানসার রোগীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে না।


