
খালেদ মোশাররফ মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই রেজিমেন্টের প্রতিটি সৈন্য ছিল তাঁর খুব চেনা, খুব আপন, নিজের হাতে গড়া সন্তানদের মতো। তাদের নিয়েই তিনি ভাবতেন, কিভাবে সেনাবাহিনীতে আবার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়, কিভাবে দখলমুক্ত দেশে ফেরানো যায় শান্তির নিশ্বাস।
সাল ১৯৭৫: বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার মাত্র ২ মাস পর, খুনি-দখলদাররা জেলখানায় হত্যা করে জাতীয় চার নেতাকে। দেশ তখন আবারও পড়ে যায় ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির দখলে।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫:সেদিন ভোরে খালেদ মোশাররফ তাঁর সহযোদ্ধা কর্নেল হায়দার ও কর্নেল নওশেরের সঙ্গে ছিলেন। হঠাৎ বাইরে অদ্ভুত এক শোরগোল—“সিপাহি বিদ্রোহ! সিপাহি বিদ্রোহ!”
হাজার হাজার সৈনিক ক্যান্টনমেন্টের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের চোখে বিভ্রান্তি, হাতে বন্দুক, কানে কেবল উসকানি—“উচ্চপদস্থ অফিসাররা দেশের সঙ্গে বেঈমানি করছে!”
খালেদ তখনও শান্ত। তিনি সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—“তোমরা আমি, সবাই একই সেনা—একই পতাকার নিচে লড়েছি। বন্দুক নামাও।” কিন্তু বিভ্রান্তির আগুন তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। কয়েকজন বিপ্লবী হাবিলদার কিছু সৈন্যকে নিয়ে মেজর জলিল ও মেজর আসাদের সঙ্গে ক্যান্টিনে প্রবেশ করল। সেনাপ্রধানের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল—“আমরা তোমার বিচার চাই!”
পাথরের মতো চোয়ালবদ্ধ খালেদের কণ্ঠে তখনও আশ্চর্য শান্তি—“ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে তোমাদের কমান্ডিং অফিসারের কাছে নিয়ে চলো।” হাবিলদার রাইফেল উঁচিয়ে চিৎকার করল—“না! আমরা এখানেই তোমার বিচার করব!”
খালেদ তখন বুঝতে পারলেন—বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী মেজরদের মতো, এদের অর্ডারও কোনো সাধারণ অফিসারের নয়।এ আদেশ এসেছে সেই হাত থেকে—যে চায় তার পথে আর কোনো বাধা না থাকুক।
“The order is specific — দ্য অর্ডার ইজ স্পেসিফিক।”
উদ্যত বন্দুকের মুখে তিনি একটুও ভীত হননি। ঠাণ্ডা চোখে, ঋজু ভঙ্গিতে বসে থাকা মানুষটাকে মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল যেন এক অকুতোভয় বাঘ। শান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন—“ঠিক আছে, তোমরা এখানেই কি বিচার করতে চাও।”
ট্যাট্যাঁরররর! এক ঝাঁক গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ।
গোলাগুলির সেই শব্দে কেঁপে উঠেছিল পুরো ভবন। এক ক্ষণস্থায়ী বিভ্রান্তির মধ্যে শেষ হয়ে গেল এক বীরের জীবন। বাংলাদেশের মাটিতে ঝরে পড়ল মুক্তিযুদ্ধের এক অমর সন্তান।তাঁর রক্তে ভিজে গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের ধুলো—যে ধুলোয় একদিন তিনি হেঁটেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনে।
সেই খালেদ মোশাররফ—যার সাহসী পরিকল্পনায় পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খানের দম্ভভরা ঘোষণা—“জুন মাসের মধ্যেই ঢাকা–চট্টগ্রাম রেললাইন খুলে দেওয়া হবে, মুক্তিদের নিশ্চিহ্ন করা হবে”—
মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
সেই যুদ্ধে একশ’র বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিল, আর রেললাইনটি আর কোনোদিন চালু হয়নি।
সেই খালেদ মোশাররফ—একাত্তরের ২৩ অক্টোবর যুদ্ধক্ষেত্রে আচমকা পাকিস্তানি মর্টার শেলের আঘাতে মাথার বাম পাশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল, তবু এক আশ্চর্য চিকিৎসা–অলৌকিকতায় তিনি ফিরে এসেছিলেন জীবনে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচতে দিল না এই দেশেরই বেইমানরা।
৭ নভেম্বর, বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য নায়ক—বীর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম)।
#fblifestyle #hilights #banglareels


