সোহানা খান

আসুন একটি ঘটনার মূল্যায়ন করি। “একদিন বিখ্যাত মুসলিম মহিলা সঙ্গীতজ্ঞ জামিলা মদীনায় একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেন আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) ইবনে আবু তালিবের সম্মানার্থে। এ অনুষ্ঠানে সঙ্গীতজ্ঞা জামিলার বাসভবনে যে সমস্ত মেয়েরা সঙ্গীত প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিল তারা সুন্দর পোশাকে বিকশিত হয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন এবং এতে শ্রোতা ও শিল্পীদের মধ্যে কোনো পর্দা টানানো ছিল না (কিতাব আল আঘানী, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬)।
.
উল্লেখ্য, মুসলিম সভ্যতার সঙ্গীতের ইতিহাসের সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো – আবুল ফারাজ আল ইস্পাহানী রচিত (মৃত্যু ৯৬৭) কিতাব আল আঘানী। এই বিরাট পুস্তকটি ২০ খণ্ডে রচিত। (ছবিতে ঐ গ্রন্থের মধ্যে অঙ্কিত মুসলিম চিত্রকরদের আঁকা মানুষের ছবিও দেখা যাচ্ছে।)
.
১. যে সময়ের কথা হচ্ছে রসুলের (সা.) সাহাবীদের অনেকেই তখন জীবিত অর্থাৎ প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা নিয়ে যে সমাজটি মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই সমাজের একটি খণ্ডচিত্র আমরা এ ঘটনার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। রসুলাল্লাহর (সা.) যে সাহাবীর সম্মানার্থে সঙ্গীতানুষ্ঠানটি করা হয়েছে তিনি এমন একজন ব্যক্তি যার জন্ম ইসলামের গর্ভে, আরব্য জাহেলিয়াতের মধ্যে নয়। তাঁর বাবা ছিলেন রসুলাল্লাহর (সা.) আপন চাচাতো ভাই জাফর (রা.) বিন আবু তালিব যিনি মুতার যুদ্ধের অন্যতম শহীদ সেনাপতি। তাঁর চাচা ছিলেন স্বয়ং আলী (রা.)। সুতরাং ১৪০০ বছর পরে এসে আমরা তাকে সঙ্গীত হালাল না হারাম এ ফতোয়া শেখাতে পারি না।
.
২. যিনি সঙ্গীতানুষ্ঠানটি করলেন তিনি একজন ‘মুসলিম নারী’। তিনি ঐ দিনই প্রথম গান করেন নি, তিনি ঐ সময়ের একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও গায়িকা। তিনি যে সঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন নি, বরং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সাহাবীদের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করেছেন যা এই ঘটনায় সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
.
৩. সঙ্গীতচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক রূপও ঐ সমাজে বিদ্যমান ছিল। জামিলার প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিক্ষালয়ে মেয়েরা গান শিখতে আসতেন, অর্থাৎ তাদের পারিবারিক সম্মতি ছিল। মনে রাখতে হবে, এই পরিবারগুলো মদীনার মুসলিম পরিবার যে পবিত্র শহর থেকে ইসলামের কুসুম বিকশিত হয়ে তদানীন্তন বিশ্বকে সভ্যতা শিক্ষা দিয়েছিল।
ঐ সমাজের মানুষগুলো প্রত্যেকেই ইসলামের মৌলিক বিষয় ও রীতি নীতি ভালোভাবে জানতেন, ইসলাম তখনও আলেমদের সম্পত্তি হয় নি। মানুষগুলো সরাসরি রসুলাল্লাহ (সা.) তথা তাঁর সাহাবীদের কাছ থেকে ব্যবহারিকভাবে ইসলামের রীতিনীতির জ্ঞান, শিক্ষা ও যাবতীয় সংস্কার লাভ করেছিলেন। তাদের ঐ সমাজে একটি ‘নিষিদ্ধ সংস্কৃতির’ চর্চা কোনো অবস্থাতেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারতো না।
৪. মেয়েগুলো এসে একটি বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। সুতরাং এটি নিশ্চিত যে তারা প্রাপ্তবয়স্কাই ছিলেন। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে, যুগসচেতন, শালীন ও দৃষ্টিনন্দন পোশাক পরে সঙ্গীতানুষ্ঠানে গান করতেন। প্রাপ্তবয়স্কা মেয়েরা পরপুরুষের নজর বাঁচিয়ে গৃহে অন্তরীণ থাকবেন এ ধারণার যারা স্রষ্টা তাদেরই তখন সৃষ্টি হয় নি। তাই তাদেরকে বেপর্দা নারী বা দাইয়্যুস বলে ফতোয়া দেওয়ার কেউ ছিল না।
..
৫. অনুষ্ঠানটিতে শ্রোতা ও নারী শিল্পীদের মধ্যে কোনো পর্দা টাঙানো ছিল না। এ তথ্যটি উল্লেখ করে লেখক বোঝাতে চাইছেন যে, সমাবেশস্থলে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দা টানানোর প্রচলন হয় আরো পরে। আমরা জানি যে মসজিদে নববীতে, জুমায়, সালাতের সময় বা যে কোনো স্থানে নারী-পুরুষরা একত্র হয়ে রসুলের (সা.) কাছ থেকে আলোচনা শুনতেন সেখানে নারী-পুরুষের মাঝে কোনো পর্দা টানানোর চর্চা ছিল না।
.
এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিন ইসলামে সঙ্গীত চর্চা নিষিদ্ধ না প্রসিদ্ধ, ঘৃণিত না আদৃত। আমি সিদ্ধান্ত দেব না। দিলে অনেকেই বলবেন, আপনি ইসলামের কী বোঝেন? আপনি কি মুফতি? পুরান পাগল ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি। তাদের এতসব ”গরুত্বপূর্ণ” প্রশ্নের জবাব দেওয়ার যোগ্যতা অধমের নেই।
সংগৃহীত


