অনলাইন প্রতিবেদক

লাখ লাখ মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগঘন পরিবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার বেলা ৩টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত এই জানাজা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজায় পরিণত হয়। মানুষের ঢল সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
জনসমুদ্রে পরিণত মানিক মিয়া এভিনিউ
বুধবার সকাল থেকেই ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দিকে ছুটে আসেন। সরেজমিনে দেখা যায়, সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে খামারবাড়ি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, ধানমন্ডি ও আগারগাঁও পর্যন্ত জনতার ঢল নেমেছে। মূল ভেন্যুতে পৌঁছাতে না পেরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন। আবেগে অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে, শোনা যায় কান্না ও দোয়ার শব্দ।
রাষ্ট্র ও বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। জানাজায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ দেশি-বিদেশি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বিদেশি অতিথিদের মধ্যে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জানাজায় শরিক হন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নারীদের অংশগ্রহণের জন্য জানাজায় আলাদা ব্যবস্থাও রাখা হয়।
জীবন ও সংগ্রামের স্মরণ
জানাজার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম সবার উদ্দেশে তুলে ধরেন। তিনি তার জন্ম, পরিবার, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, রাজনীতিতে পদার্পণ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকার নানা দিক তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
হৃদয়বিদারক বিদায় মুহূর্ত
এর আগে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আনা হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাল-সবুজ রঙের বাসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মরদেহ পৌঁছালে উপস্থিত জনতা শোক ও শ্রদ্ধায় নীরব হয়ে পড়ে। জানাজাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দাফন
জানাজা উপলক্ষে সংসদ ভবন ও মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি ২৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। শান্তিপূর্ণভাবে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ শেরেবাংলা নগরের উদ্দেশে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।
ইতিহাসের পাতায় এক আবেগঘন অধ্যায়
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা কেবল একটি শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর আবেগঘন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব, জনপ্রিয়তা এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রতিফলন হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে রইল।


