সুফি সাগর সামস্

ঢাকা যেন থমকে গিয়েছিল। রানওয়েতে নামা বিমানটি শুধু একজন মানুষের মরদেহ নয়—বয়ে এনেছিল একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, রাজপথের সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার। সবাইকে কাঁদিয়ে, চোখ ভিজিয়ে, বুক ভারী করে গতকাল সন্ধ্যায় দেশে ফিরলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের মহানায়ক—শহীদ শরিফ ওসমান হাদি।
আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে তাঁর নামাজে জানাজা। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে। যে কবি বিদ্রোহের ভাষা লিখে গেছেন, তাঁর পাশেই ঘুমাবেন এই সময়ের এক বিদ্রোহী সন্তান। তাঁর শাহাদাতে আজ সারা দেশে রাষ্ট্রীয় শোক।
বিমানবন্দরে কান্নার ঢেউ
গতকাল বিকাল ৫টা ৪৮ মিনিট। সিঙ্গাপুর থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজে-৫৮৫ যখন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে, তখন রানওয়ের আকাশটাও যেন ভারী হয়ে ওঠে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি যখন নামানো হয়, তখন আর কারও চোখ শুকনো ছিল না।
কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা, রাজপথের সহযোদ্ধারা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছিল না হাহাকার। কান্নায় ভেঙে পড়েন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আত্মীয়স্বজন ও অসংখ্য তরুণ—যাদের অনেকেই হাদির কণ্ঠে সাহস খুঁজে পেয়েছিল।
নীরব শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে ছিল একটাই প্রশ্ন—এই মৃত্যু কি শুধু একটি জীবন কেড়ে নিল, নাকি একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতকেও?
শোক থেকে ক্ষোভে রূপ নেওয়া রাত
কফিন বিমানবন্দর ছাড়ার পরও শোকের ভার কাটেনি। কেউ কেউ অপেক্ষা করছিলেন ৮ নম্বর গেটে, কেউ চলে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। পুরো বিমানবন্দর ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের অস্থিরতা থামানো যাচ্ছিল না।
সন্ধ্যা ৬টায় শহীদ হাদির মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে। রাষ্ট্র জানায়, আজ জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—যে মানুষটি নিজেই রাজপথে নিরাপত্তাহীনতায় প্রাণ দিলেন, তাঁর জানাজায় এত সতর্কতা কেন প্রয়োজন?
একটি গুলি, একটি জাতির ক্ষত
১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে গণসংযোগে অংশ নিতে গিয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ছোড়া গুলি এসে বিঁধে যায় তাঁর মাথায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, এরপর এভারকেয়ারে। শেষ আশ্রয় হিসেবে তাঁকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে।
কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিভে যায় আলো। থেমে যায় একটি স্পষ্ট কণ্ঠ। ভেঙে পড়ে অসংখ্য তরুণের ভরসার জায়গা।
এই মৃত্যুসংবাদ দেশে পৌঁছানোর পর রাজপথে নামে ক্ষোভ, শোক আর প্রতিরোধের আগুন। মানুষ বুঝে যায়—এটা শুধু হত্যা নয়, এটা একটি কণ্ঠ চুপ করানোর চেষ্টা।
যেভাবে জন্ম নিয়েছিল এক বিপ্লবী
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন সময়ের সন্তান। ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থান তাঁকে শুধু পরিচিত করেনি—তাঁকে দায়িত্বশীল করেছে। রামপুরায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন, রাজপথে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলা, তরুণদের চোখে চোখ রেখে সাহস দেওয়া—এসবই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
এই অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবেই জন্ম নেয় ইনকিলাব মঞ্চ। হাদি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে সুবিধা নয়—দায়িত্ব। তিনি বলতেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা তাঁকে জনপ্রিয় করেছে, আবার ঝুঁকির মুখেও ঠেলে দিয়েছে। তবু তিনি পিছু হটেননি।
‘তিনি এখন রাষ্ট্রের সম্পদ’
হাদির ইচ্ছে ছিল বাবার কবরের পাশে শুয়ে থাকার। কিন্তু পরিবার বলছে—এখন তিনি শুধু পরিবারের নন, রাষ্ট্রের সম্পদ।
বোনজামাই আমির হোসেনের কণ্ঠে ছিল কান্না চাপা দেওয়া দৃঢ়তা—
“আমরা চাই, ওসমান হাদির স্মৃতি মুছে না যাক। দেশের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখে।”
ঝালকাঠির নলছিটির হাঁড়িখালী গ্রামে তাঁর বাড়িতে এখন শুধু কান্না আর শূন্যতা। মানুষ বলছে—ও ছিল সাদাসিধে, কিন্তু ভেতরে ছিল পাহাড়সম দৃঢ়তা।
শেষ কথা নয়, শেষ দাবি
আজ রাষ্ট্রীয় শোকে নত বাংলাদেশ। কিন্তু শোকের পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে একটি দাবি—হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
কারণ, শরিফ ওসমান হাদি শুধু একজন মানুষ ছিলেন না।
তিনি ছিলেন প্রশ্ন করার সাহস।
তিনি ছিলেন মাথা নত না করার শিক্ষা।
তিনি ছিলেন রাজপথের বিবেক।
আজ তাঁর কফিন নামছে মাটির নিচে।
কিন্তু তাঁর আদর্শ—তা কি নামবে?
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


