বিবিসি বাংলা

রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী নরসিংদীর মাধবদীতে শুক্রবার সকালে সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই কম্পনের জেরে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু এবং পাঁচশোর বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও বাংলাদেশ ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, যা ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। কেন্দ্রটি মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল, যা এটিকে অগভীর ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ফলে কম্পনটি অনেক তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও পরিস্থিতি
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ জেলায় এই কম্পন অনুভূত হয়। আতঙ্কে বাসা-বাড়ি, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভবন ফেটে যাওয়া, দেয়াল ধসে পড়া, সিঁড়িতে হুড়োহুড়িতে আহত হওয়া এবং বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার পুরান এলাকায় বেশ কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক দল ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরিদর্শন করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শতাধিক আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন। বেশিরভাগই হুড়োহুড়ি, ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়া বা উপকরণ পড়ে আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধবদী এলাকাটি দেশের অন্যতম সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি। সাম্প্রতিক কম্পনটি ওই ফল্টে শক্তি সঞ্চয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “এটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস না হলেও এলাকায় চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন,
“মাধবদী অঞ্চলের ফল্ট লাইন বহুদিন ধরে সক্রিয়। অগভীর গভীরতায় হওয়ায় কম্পনটি বেশি অনুভূত হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য ভবনগুলোকে ভূমিকম্প সহনশীল না করলে ঝুঁকি বাড়বে।”
সরকারের ব্যবস্থা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসন জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে প্রবেশ না করার জন্য জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, রাজধানীর পুরান ঢাকার বহু ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিলো—বাংলাদেশ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবহুল ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও পুরনো অবকাঠামোর কারণে যে কোনো বড় ভূমিকম্প ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। জনগণকে সতর্কতা মেনে চলার পাশাপাশি ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


