
ভারতকে অখণ্ড রাখার শেষ সুযোগ ছিল ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব। ১৯৪৬ সালের ২৩শে মার্চ মিশন দিল্লিতে পৌঁছায়। এপ্রিল মাসের ২ তারিখে দিল্লিতে পৌঁছে মওলানা আবুল কালাম আজাদ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবগুলি পূর্ণাঙ্গভাবে শুনলেন।
সংক্ষেপে বলা যায় প্রস্তাবে বলা হয়েছিল ভারতকে তিনটি ক্লাস্টারে ভাগ করা হবে। ’এ’ ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত হবে হিন্দু অধ্যুষিত প্রদেশগুলো। ‘বি’ ক্লাস্টারে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং ব্রিটিশ বেলুচিস্তান। ক্লাস্টার ‘সি’ তে বাংলা এবং আসাম। প্রদেশগুলো সব বিষয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। ভারত হবে একটি শিথিল ফেডারেশন। তিনটি বিষয় শুধু কেন্দ্রের হাতে থাকবে। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং পররাষ্ট্র। অর্থ মন্ত্রণালয়টি পর্যন্ত প্রদেশের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। প্রদেশ ঠিক করবে তারা কীভাবে কোন খাতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করবে। যেহেতু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে উপরোক্ত তিনটি বিষয় ছাড়া সবকিছুই প্রদেশের নির্বাচিত সরকার নিজেরাই পরিচালনা করবে, তাই হিন্দুদের আধিপত্যের আশঙ্কা থেকে মুসলমানরা মুক্ত হতে পারবে। ক্যাবিনেট মিশন এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে ১৫ই মে তারিখে।
এই বিষয়ে আলোচনার জন্য মুসলিম লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলো তিনদিন ধরে। শেষদিনে জিন্নাহ স্বীকার করলেন– ক্যাবিনেট মিশন যে পরিকল্পনা উপস্থিত করেছে, তার চেয়ে ন্যায্যতম কোনো সমাধান ভারতবর্ষের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য নেই। কোনোভাবেই তিনি এর চেয়ে ভালো সমাধান দিতে পারবেন না।
কাউন্সিল জিন্নাহ-র কথা মেনে নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমেএই প্রস্তাব পাশ করল।
জিন্নাহ তখন পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে সরে এসে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ ছিল না। কারণ জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ ১৯৪০ সাল থেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৪৬ সাল নাগাদ সারা ভারতের মুসলমান নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের দাবিতে মোটামুটি একমত হয়েছিলেন। জিন্নাহ এই সময় পাকিস্তান দাবি ছেড়ে সরে আসায় তারা হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ মওলানা আজাদের সাথে দেখা করতে এলেন। আজাদ তাদের বোঝাতে পেরেছিলেন যে জিন্নাহ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।
মওলানা আজাদ লিখছেন— পাকিস্তান পরিকল্পনা যদি কোনোভাবে মুসলমানদের উপকারে আসে, তাহলে আমি নিজেই তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত, এবং অন্যরা যাতে তা গ্রহণ করে তার জন্য কাজ করব। কিন্তু সত্য হলো, এমনকি পরিকল্পনাটিকে আমি যদি মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও পরীক্ষা করি, তাহলেও সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হই যে তা কোনোভাবেই মুসলমানদের উপকারে আসবে না বা তাদের যৌক্তিক ভীতির অবসান ঘটাতে পারবে না।
জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব মেনে নেওয়ায় মওলানা আজাদের মন শান্তিতে ভরে গেল। তিনি জানতেন যে কংগ্রেস এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে।। কারণ তিনি নিজেই ভারতকে অখণ্ড রেখে সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের যে ফর্মুলা প্রস্তুত করেছিলেন, তা এই ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবেরই অনুরূপ। সেই ফর্মুলা গান্ধীসহ কংগ্রেসের সকলেই মেনে নিয়েছিল। যথারীতি কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি মেনে নিল ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব। সারাদেশে বয়ে গেল খুশির বন্যা।
কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে জওহরলাল নেহরু ঘোষণা করে বসলেন—কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব পুরোপুরি মেনে নেয়নি। তারা অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে, এটুকুই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে সংখ্যাগারিষ্ঠ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন মিশন প্রস্তাবের সংশোধন বা পরিমার্জনা করা হবে কি না।
এটি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত মোটেও ছিল না। ছিল নেহরুর একক মতামত। সারাদেশ থমকে গেল।
কী করা যায়! মওলানা আজাদ জওহরলাল নেহরুকে পরামর্শ দিলেন, পরদিন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দিতে। কিন্তু জওহরলাল রাজি হলেন না। মাত্র কয়েকদিন আগে মওলানা আজাদের স্থলে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন। এখন তিনি ভুল স্বীকার করলে, তার মতে, কংগ্রেস দুর্বল হয়ে যাবে। অতএব তিনি এমন বিবৃতি দিতে পারবেন না। দিলেন না। তাকে সমর্থন জানালেন বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং গোঁড়া হিন্দু সদস্যরা।
উল্লেখ্য একটানা সাত বছর কংগ্রেসের সভাপতি থাকার পরে মওলানা আজাদ গান্ধীসহ সকলের অনুরোধ উপেক্ষা করে দ্বিতীয় টার্মে কংগ্রেসের সভাপতি হতে রাজি হননি। পরবর্তী সভাপতি হিসাবে তিনিই জওহরলাল নেহরুর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরে আজাদ স্বীকার করেছেন, এই দুই সিদ্ধান্ত ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
জিন্নাহ মেনে নিয়েছিলেন ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব। জওহরলাল নেহরুর বক্তব্য শুনে তিনি ঘোষণা করলেন—ব্রিটিশরা থাকতেই যদি কংগ্রেস তথা হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব বাতিল বা সংশোধন করার কথা বলে, তাহলে স্বাধীনতার পরে তারা তো মুসলমানদের কোনো কথা কানেই তুলবে না। তিনি তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন পকিস্তানের দাবিতে। ভারতবর্ষ অবিভক্ত রাখার শেষ চেষ্টাটি ব্যর্থ হলো। ভারতভাগ জিন্নাহ একাই ভিলেন নন।
সূত্র : ফেসবুক


