অনলাইন ভার্সন
ঢাকা: স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে কার্যত নস্যাৎ করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ একটি লোক দেখানো ও ফাঁপা উদ্যোগে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, জুলাই আন্দোলনের অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে সামগ্রিক পুলিশ সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, এই অধ্যাদেশ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী পুলিশ কমিশন গঠিত হলেও তা স্বাধীন হবে না এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম হবে না। বাস্তবে এটি সরকারের আজ্ঞাবহ অবসরপ্রাপ্ত ও প্রেষণে নিয়োজিত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার আরেকটি কাঠামোতে পরিণত হবে, যেখানে জনগণের অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি প্রবল।
অধ্যাদেশের মৌলিক ত্রুটি
গত ৯ ডিসেম্বর জারি করা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে মৌলিক ধারণাগত, কৌশলগত ও কাঠামোগতভাবে গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, অধ্যাদেশটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন ও উদ্দেশ্য ধারণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে এই অধ্যাদেশ পুলিশ বাহিনীর ওপর প্রশাসনিক ও পুলিশি আমলাতন্ত্র—বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের—নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করবে। এর ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও বহুমাত্রিক অপরাধের অভিযোগে পুলিশের যে জন-আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনের কোনো বাস্তব পথ খুলবে না।
স্বাধীনতার অনুপস্থিতি ও স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, যে পুলিশ কমিশনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জনগণ ও নাগরিক সমাজ জানিয়ে আসছে, তার অন্যতম অপরিহার্য শর্ত হলো সরকারের প্রভাব থেকে কার্যকর স্বাধীনতা। অথচ অধ্যাদেশে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত নেই।
কমিশনের গঠনসংক্রান্ত বিধানগুলোতেও স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি স্পষ্ট বলে মনে করে টিআইবি। অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে কমিশনের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশেষ করে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব হিসেবে নির্ধারণ কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। টিআইবির মতে, বাংলাদেশের অন্য কোনো কমিশনে কিংবা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় এ ধরনের বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তির নজির নেই।
অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার দুর্বলতা
অধ্যাদেশের কয়েকটি ধারার সমালোচনা করে টিআইবি জানায়, নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও পুলিশের অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি—উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ কমিশনেরই তিনজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। এতে আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশি প্রভাবজনিত স্বার্থসংঘাত সৃষ্টি হবে এবং অভিযোগের স্বাধীন ও ন্যায়নিষ্ঠ নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া ১৯(২) অনুচ্ছেদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত অভিযোগ ‘সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি’র বিধানকে গুরুতর অন্তর্ঘাত হিসেবে দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কর্তৃত্বই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব
অধ্যাদেশের ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে টিআইবি বলছে, প্রস্তাবিত কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতার অভাব এবং প্রশাসনিকভাবে আমলাতন্ত্র ও পুলিশের প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিশনকে কার্যত সরকারের একটি অধীন দপ্তরে পরিণত করবে। প্রস্তাবিত কাঠামো বহাল থাকলে দেশে প্রকৃত পুলিশ সংস্কারের সম্ভাবনা কার্যত শূন্যে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির আহ্বান
সরকারের অভ্যন্তরে সংস্কারবিরোধী চক্রের কাছে নতজানু অবস্থানের অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধন ও ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এমনভাবে অধ্যাদেশ সংশোধন করতে হবে যাতে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের বাইরে কার্যকর পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।



