ইশতিয়াক মাহমুদ মানিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী এরশাদউল্লাহও একই ধরনের হামলার শিকার হন। এই দুটি ঘটনা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক নেতা, বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করছেন, এসব হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং নির্বাচন ঘিরে সহিংস রাজনীতির পুনরাবির্ভাবের ইঙ্গিত।
কেন ঘটনাটি গুরুত্ব পাচ্ছে?
১. সময় নির্বাচনকালীন
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই এমন হামলা রাজনৈতিক বার্তা বহন করে—এমন ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল। এতে নির্বাচনী মাঠে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২. লক্ষ্য ব্যক্তি প্রতীকী
শরিফ ওসমান হাদি জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত একজন পরিচিত মুখ। তাঁর ওপর হামলাকে অনেকেই সেই আন্দোলনের চেতনার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
৩. আগাম হুমকির তথ্য
হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যার হুমকির কথা জানানো হলেও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি—এ অভিযোগ প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্বেগ কোথায়?
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল বলছে, নিরাপত্তাহীন পরিবেশে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না। দলগুলোর ভাষায়, আজ একজন প্রার্থী আক্রান্ত হলে আগামীকাল যে কেউ লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুফি সাগর সামস্ মনে করছেন, এই উদ্বেগ কেবল দলীয় নয়; এটি নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের প্রতিফলন।
নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব কী হতে পারে?
- প্রচারণায় বাধা: প্রার্থীরা প্রকাশ্যে কর্মসূচি চালাতে সংকোচ বোধ করতে পারেন।
- ভোটার উপস্থিতি কমা: ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলে অংশগ্রহণ কমতে পারে।
- অসম প্রতিযোগিতা: সহিংসতা থাকলে প্রভাবশালী পক্ষ সুবিধা পায়।
এতে নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে অনুষ্ঠিত হলেও তার গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ কী?
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জ—
১. দ্রুত তদন্ত করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা
২. প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা
৩. নির্বাচনী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জায়গায় ব্যর্থতা নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
‘জুলাই অভ্যুত্থান’ প্রসঙ্গ কেন বারবার আসছে?
জুলাই গণ অভ্যুত্থান ছিল নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবির প্রতীক। ওসমান হাদির ওপর হামলাকে সেই দাবির পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকে।
তাঁদের মতে, এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ না হলে অভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশা বাস্তবায়ন হবে না।
সামনে কী হতে পারে?
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর। কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে আস্থা ফিরতে পারে। অন্যথায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা বিতর্ক ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা থেকে যেতে পারে।
নির্বাচন সামনে রেখে সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে নিরাপদ রাখতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা।


