সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সাফল্যগাথা তুলে ধরলেও বাস্তব চিত্র এখন উল্টো দিকেই হাঁটছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে—গত চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে অনুমান করেছে সংস্থাটি। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে ৩ কোটি ৬০ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
এই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস প্রকাশ করা হয় গত মঙ্গলবার রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। প্রতিবেদনটির আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)।
দারিদ্র্যের সরকারি হিসাব বনাম বিশ্বব্যাংকের অনুমান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের সর্বশেষ খানা আয়ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। কিন্তু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি-ডলার সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং আয়ের অসাম্য বাড়ার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে—দারিদ্র্য এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালের পর পরিসংখ্যান ব্যুরোর নতুন জরিপ প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতির সরকারি স্বীকৃত চিত্র অনুপস্থিত। তবে বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দারিদ্র্য উন্নয়ন সূচকের জন্য আবার বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
দারিদ্র্য বাড়ার কারণ: বহুমাত্রিক সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণ কাজ করছে—
১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
দুই বছর ধরে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম লাগামহীন। বাস্তব আয়ের তুলনায় ব্যয় গতিশীলভাবে বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন- ও মধ্যবিত্তের জীবনমান ভেঙে পড়ছে। মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে শহরের গরিব ও গ্রামীণ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর।
২. কর্মসংস্থান সংকট ও আয় হ্রাস
অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে, চাকরি হারানোর ঘটনা বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির হার স্থবির। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ
ডলার সংকট আমদানি সীমিত করেছে, উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে এবং শিল্পক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ছে।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ঘাটতি ও বণ্টনজট
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাজেট বরাদ্দ থাকলেও দারিদ্র্য টার্গেটিংয়ের দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে অনেক দরিদ্র পরিবার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জনগণের বাস্তব সংকট
বিশ্বব্যাংক ও পিআরআই-এর আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সমীকরণে ব্যস্ত থাকলেও—সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় চাপে রয়েছে।
-
দ্রব্যমূল্য বাড়ছে
-
চাকরি কমছে
-
আয় বাড়ছে না
-
নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে
অর্থনীতির এই চাপ মানুষের জীবনমানকে গভীরভাবে আঘাত করছে। বক্তাদের মতে, দারিদ্র্য দ্রুত না কমলে ভবিষ্যতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—সবখানেই বড় ধাক্কা লাগার ঝুঁকি রয়েছে।
আগামীর করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণে কিছু জরুরি পদক্ষেপ সুপারিশ করেছেন—
-
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ
-
কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রণোদনা
-
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো
-
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ করা
-
টার্গেটেড সহায়তা দ্রুত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো
-
সুশাসন, দুর্নীতি কমানো ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বিশ্লেষণ বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। উন্নয়ন অর্জন ধরে রাখতে হলে দারিদ্র্য বৃদ্ধিকে থামানো এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরে গিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে—না হলে দারিদ্র্যের এই ঊর্ধ্বগতি আগামী কয়েক বছরে আরও বড় সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


