ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

খামেনিবিরোধী বিক্ষোভে টালমাটাল ইরানে হঠাৎ করেই নাটকীয় মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তরুণ এরফান সোলতানির ফাঁসি কার্যকর না হওয়া এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের ঘোষণায় দেশজুড়ে উত্তেজনা সাময়িকভাবে প্রশমিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সুর নরম’ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।
মৃত্যুদণ্ড স্থগিত: সরকার কি চাপের মুখে?
সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হওয়ার খবর আসে তাঁর পরিবারের সদস্য এবং নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগাওয়ের সূত্রে। যদিও দণ্ড পুরোপুরি বাতিল হয়নি, তবু এই সিদ্ধান্তকে ইরান সরকারের একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চাপ এবং সম্ভাব্য বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে তেহরান আপাতত উত্তেজনা কমাতে চেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও ইরানের সংশয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি আশ্বাস পেয়েছেন যে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও প্রকাশ্যে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাসান আহমাদিয়ানের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য ইরান পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না। অতীত অভিজ্ঞতায় আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার নজির রয়েছে—এ কারণেই উদ্বেগ রয়ে গেছে।
রণতরি মোতায়েন: শান্তির বার্তার আড়ালে শক্তি প্রদর্শন?
বিক্ষোভ স্তিমিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগর থেকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নেতৃত্বাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড অঞ্চলে পৌঁছাবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর কৌশল।
ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা
ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে কে আসতে পারেন—এই প্রশ্নে রেজা পাহলভির নাম আলোচনায় এলেও ট্রাম্প নিজেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পাহলভি ‘ভদ্র মানুষ’ হলেও ইরানের জনগণ তাঁকে গ্রহণ করবে কি না, তা অনিশ্চিত। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার পতনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে সেটি এখনো অনিশ্চিত পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমানে ইরান দৃশ্যত শান্ত, বিমান চলাচলও পুনরায় শুরু হচ্ছে। কিন্তু এই শান্তি ভঙ্গুর। মৃত্যুদণ্ড স্থগিত, বিক্ষোভ স্তিমিত হওয়া এবং ট্রাম্পের আশ্বাস—সবই সাময়িক স্বস্তি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বহর মোতায়েন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আঞ্চলিক উত্তেজনার অবসান হয়নি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে একটি ভুল হিসাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন সংকটে ঠেলে দিতে পারে।


