ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

আজ ১৯ জানুয়ারি। স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে দেশজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনসমূহ।
১৯৩৬ সালের এই দিনে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। বিশিষ্ট রসায়নবিদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন দম্পতির পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শৈশবের ডাকনাম ছিল ‘কমল’। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষা ও স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নৃশংস আক্রমণ শুরু করে, তখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে নিজ ব্যাটালিয়নের পাকিস্তানি অধিনায়ককে বন্দি করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই ঘোষণাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে জাতিকে নতুন উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ করে।
পরবর্তীতে তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। অসীম সাহস ও কৌশলের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি হয়ে ওঠেন এক কিংবদন্তি সেনানায়ক। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান ‘বীরউত্তম’ খেতাব।
রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের এক চরম সংকটকালে সৈনিক-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত অধ্যায়।
ক্ষমতায় এসেই তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের মুক্ত পরিবেশ। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে ভিন্নমতের পথ খুলে দেন। ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ ধারণা প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রে সূচনা করেন ব্যাপক সংস্কার।
কৃষিবিপ্লবের অংশ হিসেবে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে খনন ও পুনঃখনন করা হয় প্রায় ১ হাজার ৪০০ খাল। গণশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে অল্প সময়ে প্রায় ৪০ লাখ নিরক্ষর মানুষ অক্ষরজ্ঞান লাভ করেন। গ্রাম সরকার ও প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের মাধ্যমে গ্রামীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
বিএনপি প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিনিই হন দলের প্রথম চেয়ারম্যান। তাঁর হাতে গড়া বিএনপি পরবর্তী সময়ে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এই মহান রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে আসেন তাঁর সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দলকে নেতৃত্ব দেন এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অবিচল থাকেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর ইন্তেকালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান।
দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ সোমবার বেলা ১১টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা। এ আয়োজনে উপস্থিত থাকার জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিএনপির সিনিয়র নেতারা বক্তব্য রাখবেন। এ ছাড়া আজ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে আয়োজন করা হচ্ছে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজন করছে মেডিকেল ক্যাম্পসহ নানা সামাজিক কর্মসূচি।
ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় এক নাম
স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে, যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী অধিনায়ক হিসেবে এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।
৯০তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করছে সেই ক্ষণজন্মা পুরুষকে—যাঁর জীবন ও কর্ম আজও আলো জ্বালায় স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলায়।


