মহানগর ডেস্ক

১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করা ইশরাক হোসেন অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা-র জ্যেষ্ঠ পুত্র। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও ২০১৯ সালের আগে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। বাবার মৃত্যুর পর ‘ফুলটাইম’ রাজনীতিতে নাম লেখান এবং অল্প সময়েই বিএনপির তৃণমূল ও সাধারণ মানুষের কাছে নিজস্ব একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন।
রাজনীতিতে আসার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে দেশ ও নগরবাসীর প্রতি তার দায়বদ্ধতাই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পরিচয়
ঢাকার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা থেকে ও-লেভেল ও এ-লেভেল সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান ইশরাক। তিনি University of Hertfordshire থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে যুক্তরাজ্যের মোটরগাড়ি শিল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন।
উচ্চশিক্ষিত ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এই পরিচয় তাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
২০২০ সালের নির্বাচন: বিতর্ক ও আইনি লড়াই
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের বড় টার্নিং পয়েন্ট। ফলাফল ঘিরে বিতর্ক ও ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ফলাফল বাতিল করে তাকে প্রকৃত বিজয়ী ঘোষণা করে।
পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও আইনি জটিলতার কারণে সে সময় তিনি শপথ নিতে পারেননি। এই অধ্যায় তাকে ‘লড়াকু’ নেতার তকমা এনে দেয়।
প্রথমবার এমপি, এরপরই প্রতিমন্ত্রী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন ইশরাক হোসেন। তিনি ৭৮ হাজার ৮৫০ ভোট পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুল মান্নানকে ২৩ হাজার ১৫৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া তার রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আধুনিকায়ন ও মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
আবারও ‘নগর ভবন’-এর পথে
প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি নতুন করে ডিএসসিসি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতির শীর্ষপর্যায়ে থেকেও নগরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে তার আগ্রহ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সমর্থকদের মতে, আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নেই তার এই সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, একই সঙ্গে জাতীয় দায়িত্ব ও স্থানীয় রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা হবে তার বড় চ্যালেঞ্জ।
দলের ভরসা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি
ইশরাক হোসেন নিজেকে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ, শিক্ষিত ও রাজপথে সক্রিয় নেতৃত্ব হিসেবে তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে মেয়র পদে লড়াই ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব—এই দ্বিমুখী ভূমিকায় তার রাজনৈতিক দক্ষতার প্রকৃত পরীক্ষা হবে সামনের দিনগুলোতে।
উত্তরাধিকার থেকে আত্মপ্রতিষ্ঠা—ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক যাত্রা এখন এক নতুন মোড়ে। জাতীয় সংসদ থেকে নগর ভবন—এই দ্বৈত লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি কতটা সফল হন, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে তার অবস্থান কতটা দৃঢ় হবে।


