সুফি সাগর সামস্

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, তা হলো বিদেশি সরকার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ। সামরিক শক্তি, কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমন্বয়ে পরিচালিত এই নীতি বহু দেশে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল প্রায়শই হয়েছে ভয়াবহ—গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় ভাঙন এবং চরমপন্থার উত্থান।
গবেষণায় কী বলছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউন্স তাঁর আলোচিত গ্রন্থ Catastrophic Success: Why Foreign-Imposed Regime Change Goes Wrong-এ দেখিয়েছেন,
১৮১৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে অন্তত ১২০ বার বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ফরেন ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ (FIRC)। ডাউন্সের গবেষণা অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার পতনে ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় টানা তিনটি সরকার উৎখাতের ঘটনাও এই ইতিহাসের অংশ।
ভেনেজুয়েলা: তালিকার নতুন সংযোজন
সবশেষ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ তালিকায় ৩৬তম সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হুগো শাভেজ ও মাদুরোর শাসনামলে দুর্নীতি, তেলনির্ভর অর্থনীতির পতন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দেশটি আগেই গভীর সংকটে পড়েছে।
এর ফল—লাখো শরণার্থী, খাদ্য ও ওষুধ সংকট এবং ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় কাঠামো।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমন ভঙ্গুর বাস্তবতায় নতুন করে বিদেশি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল না করে বরং আরও জটিল ও সহিংস করে তুলতে পারে।
ইরাক: সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার উদাহরণ
যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি দেখা গেছে ইরাকে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণের পর জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র—
-
২০০৬ সালেও ইরাকে চলছিল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
-
বাগদাদের রাস্তায় পড়ে থাকত শত শত বেওয়ারিশ লাশ
-
অধিকাংশ নিহত ছিলেন তরুণ পুরুষ, অনেকের হাত বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যেত মরদেহ
সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী ভেঙে দেওয়ার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেখানে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া ও সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় শিয়া–সুন্নি গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে আইএসের উত্থান—যার ক্ষত আজও বহন করছে ইরাক।
আফগানিস্তান: ২০ বছরের যুদ্ধ, শূন্য ফলাফল
ইরাকের মতোই আফগানিস্তানেও যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ নীতি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
২০ বছরের যুদ্ধ, বিপুল অর্থব্যয় ও হাজারো প্রাণহানির পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রকে তালেবানের হাতেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশ ছাড়তে হয়—যা ওয়াশিংটনের বৈদেশিক নীতির বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত।
কেন ব্যর্থ হয় রেজিম চেঞ্জ?
অধ্যাপক ডাউন্স রেজিম চেঞ্জ ব্যর্থ হওয়ার দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন—
-
নিরাপত্তা কাঠামোর ভাঙন
সরকার পতনের পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী ভেঙে পড়ে। হাজার হাজার সশস্ত্র সদস্য বিদ্রোহী বা মিলিশিয়ায় পরিণত হয়। -
জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার সংকট
বিদেশি শক্তির বসানো নতুন নেতৃত্ব জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং দ্রুতই ‘পুতুল সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
কখন সফল হয়েছে রেজিম চেঞ্জ?
ইতিহাস বলছে, রেজিম চেঞ্জ কেবল তখনই তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে, যখন—
-
সংশ্লিষ্ট দেশে আগে থেকেই গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ছিল
-
সমাজ ছিল তুলনামূলকভাবে একজাতীয় ও ঐক্যবদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপান ও জার্মানি এর উদাহরণ। বিপরীতে, ইরাক, লিবিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো বিভক্ত সমাজে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কখনোই টেকসই ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি।
রেজিম চেঞ্জ তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটালেও দীর্ঘমেয়াদে তা প্রায়ই জন্ম দেয় রাষ্ট্রীয় ভাঙন, গৃহযুদ্ধ ও চরমপন্থার। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার সামনে আনছে—
ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে কি ওয়াশিংটন একই ভুল বারবার করে যাচ্ছে?
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


