নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি–জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামায় নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারা বজায় রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই প্রধান লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও লক্ষ্য মাত্রার উপরে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে—
-
নির্বাচন, রমজান ও সরকারি ব্যয়ের চাপ মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে
-
তাই এ মুহূর্তে সুদহার কমানো ঝুঁকিপূর্ণ
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে না আসায় সুদহার কমানোর সুযোগ নেই।
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত, কঠোর অবস্থান বহাল
নতুন মুদ্রানীতিতে—
-
নীতি সুদহার: ১০% (অপরিবর্তিত)
-
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: অব্যাহত
-
মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য: ৭% এর নিচে
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।
ঋণ প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রা সরবরাহ: মিশ্র সংকেত
নতুন মুদ্রানীতিতে কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে—
-
বেসরকারি খাত ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য: ৮.৫%
-
ব্রড মানি (মুদ্রা সরবরাহ) লক্ষ্য: ১১.৫%
তবে বাস্তবে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের নিচে ছিল এবং সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের তুলনায় বেশি হয়েছে— যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমার বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি ঋণ ও বাজার চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত সরকারি ঋণগ্রহণের কারণে—
-
ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে
-
ফলে বেসরকারি খাত “ক্রাউডিং আউট”-এর মুখে পড়ছে
এ অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমুখী হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
ঢাকা চেম্বারসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে—
-
দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার শিল্প বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়
-
নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদন কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়
তাদের মতে, শুধুমাত্র সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।
রাজনৈতিক ও নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান বলেছেন—
-
মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন
-
বাজার ও সরকারি নীতির সমন্বয় প্রয়োজন
এছাড়া রাজনৈতিক ঝুঁকি ও ব্যাংকিং খাতের চাপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
স্বল্পমেয়াদে:
-
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
-
নির্বাচন ও মৌসুমি ব্যয়ের চাপ সামাল
মধ্যমেয়াদে:
-
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো
-
ব্যাংকিং খাতের তারল্য ভারসাম্য
দীর্ঘমেয়াদে:
-
নীতিগত সমন্বয়
-
সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হয়েছে। সামনে বড় প্রশ্ন— মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে সঙ্গে কত দ্রুত মুদ্রানীতিতে শিথিলতা আনা সম্ভব হবে।


